সমুদ্রের পানি সরে গিয়ে রাস্তা তৈরি হল ১ ঘণ্টার জন্য!

জানা অজানা ডেস্কঃ

দক্ষিণ কোরিয়ার শিনদো আইল্যান্ড এক রহস্যময় দ্বীপ। শিনদো ও মোদো পাশাপাশি দুটো দ্বীপ। প্রতিবছর বসন্ত থেকে গ্রীষ্মকালের মাঝামাঝি সময় দু’বার দুই দ্বীপের মধ্যবর্তী পানি সরে গিয়ে রাস্তা তৈরি হয়। ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৪০ মিটার প্রশস্ত এই রাস্তা দেখে মনে হয় দ্বীপদুটির সংযোগকারী সেতু। ঘটনাটা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং রাস্তার স্থায়ীত্বকাল মাত্র একঘণ্টা।

অনেক কোরিয়ানরা এই ঘটনাকে বলেন “মোজেস মিরাকল”। ইসলামের নবী মুসার এই ঘটনা কোরআনেও বর্ণিত আছে। আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে মিশরের শাসক ফেরাউনের তাড়া খেয়ে মুসা (আ.) অনুসারীদের নিয়ে নীল নদের সামনে এসে আটকা পড়েন। তখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে তার লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করেন। সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের তার বারোটি গোষ্ঠীর জন্য ১২টি রাস্তা তৈরি হয়ে যায়। সেই রাস্তা দিয়ে তারা নিরাপদে ওপর চলে যান। আর পানিতে ডুবে মরে ফেরাউনসহ তার অনুসারীরা।

উতসবের ভিডিওগুলো দেখে নিতে পারেন এখানে

কোরিয়ানরা তাদের দেশের এই অদ্ভুত ঘটনাটিকে প্রতি ব্ছর ঘটা করে উদযাপন করে। তারা এই উৎসবের নাম দিয়েছে ‘শিনদো মিরাকল সি রোড ফেস্টিভ্যাল’। দর্শনার্থীরা এ রাস্তায় ভ্রমণ করাটাকে বেশ উপভোগ করে কারণ, এখানে তারা সামুদ্রিক ঝিঁনুক ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক শামুক ও ছোট মাছ ধরতে পারে।

কিন্তু উৎসবে মাতোয়ারা হলে চলবে না। কারণ, সমুদ্রের মধ্যবর্তী রাস্তাটির আয়ু মাত্র এক ঘণ্টা। মিস করেছেন তো ‍মৃত্যু অনিবার্য! এই ঘটনার পেছনের গল্পের একটি কোরীয় সংস্করণ আছে: শিনদো দ্বীপে এক বৃদ্ধা ও একটি বাঘের ভাস্কর্য রয়েছে। কথিত আছে, শিনদো দ্বীপে এক সময় অনেক বাঘ ছিল এবং সেগুলো প্রায়ই গ্রামে আক্রমণ করত। একবার আক্রমণের সময় গ্রামের সবাই মোদো আইল্যান্ডে পালাতে সক্ষম হয়। কিন্তু ওই বৃদ্ধা ও তার পরিবার পালাতে পারে না। তখন তিনি সমুদ্র দেবতার কাছে অনেক কাকুতি মিনতি করেন। সমুদ্র দেবতা তাকে বলেন, পরদিন সমুদ্রে রঙধনুর মতো রাস্তা দেখা যাবে। দেবতার কথামতো বৃদ্ধা পরদিন সমুদ্রের কাছে গিয়ে সত্যি সত্যি রাস্তা দেখতে পান। এতো গেল প্রচলিত লোককাহিনী। কিন্তু এ ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখা কী?

এর পেছনে মূল কারণ হলো বছরের মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত সমুদ্রের ওই অঞ্চলটায় ভাটা থাকে। প্রশ্ন থাকতে পারে বছরের ওই সময়ই কেন সমুদ্র আলাদা হয়ে যায়। আমরা জানি, পৃথিবীর উপর সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণের কারণে জোয়ার ভাটা হয়। কিন্তু এ ধরনের জোয়ারতো সারা বছরই পর্যায়ক্রমিক ভাবে হতে থাকে, তাহলে বছরের শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ই কেন এমন ঘটনা ঘটে। এর সন্তোষজনক জবাব পেতে হলে টাইডাল হারমনিকস সম্বন্ধে ধারণা থাকতে হবে।

সহজভাবে বললে সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী নিজস্ব কক্ষপথে আবর্তন কালে তাদের অবস্থান এমন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ায় যখন চাঁদ ও সূর্যের সম্মিলিত আকর্ষণে পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় জোয়ারের পরিমান অনেক কম থাকে। শিনদো দ্বীপের ওই জায়গাটা একটু উঁচু হওয়ার কারণে পানি সরে গিয়ে রাস্তা জেগে ওঠে।

ভিজ্যুয়াল দৃশ্যে দেখুন মোজেস মিরাকল

প্রতি বছর ওই নির্দিষ্ট দিনটিতে নানা আয়োজন করা হয়। গত বছর উৎসব ছিল এপ্রিলের ৭ তারিখ। আর্ট এক্সিবিশন, স্ট্রিট পারফরম্যান্স, ফোকলোর মিউজিক কনসার্ট থেকে শুরু করে স্থানীয় নানা সংস্কৃতি ও রীতির মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় যা ছিল তা হলো কোরিয়ান শিনদো ডগের চিত্তাকর্ষক স্টান্ট, যা দর্শক মাত্রই মুগ্ধ করবে। বলা হয়, এই শিনদো ডগ খুবই বিশ্বস্ত ও প্রভূভক্ত এবং তাদের উৎপত্তি এই শিনদো দ্বীপেই। এই জায়গাটি এখন স্থানীয় ও বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই স্থান ভ্রমণে আসেন।

উতসবের ভিডিওগুলো দেখে নিতে পারেন এখানে