‘মুক্তিপণ দিয়েওমিলছে না মুক্তি ’! প্রবাসে জিম্মি যুবকদের কান্না!

মো: ইমাম উদ্দিন সুমন, নোয়াখালী প্রতিনিধি :

লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয়ার পরও দেশে ফিরতে পারছেন না বাহরাইনে আটকে পড়া নোয়াখালীর কয়েক যুবকসহ বিভিন্ন জেলার ভুক্তভোগী প্রবাসি বাংলাদেশী। আরো টাকা না দিলে তাদের সিরিয়ার উগ্রবাদী আইএস বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে।

এদিকে তাদের বিদেশে পাঠাতে সর্বস্বান্ত পরিবার। তার ওপর দিতে হয়েছে মুক্তিপণও। কিভাবে তাদের দেশে ফেরত আনবে সেই চিন্তায়ই পরিবারের সদস্যরা দিশাহারা। পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। যারা কিন্তু যারা লাখ লাখ টাকা নিয়ে ওই যুবকদের বাহারাইন পাঠিয়েছে তারা প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সূত্রমতে, ঢাকার ফকিরাপুল মালেক মার্কেটের আইকো ইন্টারন্যাশনাল ও দালাল বাহার, মিজান, কামাল, মফিজসহ (গোটা মফিজ) একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ২৩শে আগস্ট বাহারাইন পাঠানো হয় তাদের।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের তৈয়বপুর গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে আকবর হোসেন সেন্টু বলেন, মাগুরা সদর উপজেলার গোলাম আনসারের ছেলে কায়সারুজ্জামান মধুসহ বেগমগঞ্জের তোফায়েল আহমেদের ছেলে বেল্লাল, আবুল বাশারের ছেলে মিজানুর রহমান রাশেদ, ছয়ানীর সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিনের ছেলে আরাফাত ও একই এলাকার হুমায়ন, আলাউদ্দিন, সোলাইমানসহ বেশকিছু যুবককে বাহারাইন পাঠায় দালালরা।

প্রথমে ভিসা বাবদ তাদের ছয় লাখ টাকা দেয়া হয়। ভালো বেতনে চাকরির কথা বলে তাদের বিদেশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বাহারাইন যাওয়ার পরে তাকেসহ আরো কয়েকজন যুবককে এক পাকিস্তানির কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। এ দিকে ওই পাকিস্তানি তাদের কাছে থাকা খাওয়া বাবত টাকা চাইলে তারা টাকা দিতে না পারায় তাদের ওপর শুরু করে নির্যাতন। এর আগেই তাদের পাসপোর্ট রেখে দেয় দালাল মিজান ও বাহার।

এ ঘটনা জানার পর তারা বাহারকে ফোনে অনুরোধ করেন তাদের পাসপোর্ট ফেরত দেয়ার জন্য যাতে তারা অন্তত দেশে ফেরত আসতে পারেন। দালাল বাহার তাদের হুমকি দিয়ে বলে, বেশি বাড়াবাড়ি করলে চাঁদাবাজির মামলা দেয়া হবে। পরে মুক্তিপণ এবং ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়ে সেন্টু বাহারের কাছ থেকে পাসপোর্ট ফেরত নেন। পাসপোর্ট পাওয়ার পরে তার পরিবার তাকে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করে। দেশে ফিরে থানায় মামলা করতে চাইলে তৎকালীন বেগমগঞ্জ ওসি (তদন্ত) জসিম উদ্দিন মামলা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

পরে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ২০১৬ সালের ২৭শে ডিসেম্বর ইউসুফ নামের এক ব্যক্তিও রাজধানীর মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ওই ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়, তার ভাই সোলায়মানকে কামাল ও মফিজুল হক বিদেশে পাঠানোর কথা বলে ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা নেয়। অনেক দিন টালবাহানার পরে ২০১৬ সালের ৬ই নভেম্বর সোলায়মান নামে আরো এক ব্যক্তিকে তারা বাহারাইন পাঠায়। সেখানে পাঠানোর পরে তাকে চাকরি দেয়ার কথা বলে আরো ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এদিকে সোলায়মান জানান, সে বাহারাইন যাওয়ার পরে দালাল বাহার ও মিজান তার কাছ থেকে পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। পরে তাকেও সেন্টুর মতো আটকে রাখা হয়।

সোলায়মান অভিযোগ করে, তাকে ১ মাস ২০ দিন আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। পরে তারা তার কাছ থেকে জোর করে আরো ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর পাসপোর্ট ফেরত চাইলে তাকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বলে। পরে র‌্যাবের সহায়তায় তিনি দেশে ফিরতে পেরেছেন বলে জানান। বেল্লাল হোসেন বাবু নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তার ভাই মিজানুর রহমান রাশেদকে দালাল কামাল এবং দালাল মফিজের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে বাহারাইন পাঠিয়েছেন। জমি বিক্রি করে এবং সুদে টাকা এনে তিনি তার ভাইকে বিদেশ পাঠান। তার ভাই এখনো বন্দি। তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে বললে মানব পাচারকারীরা আরো টাকা দাবি করে। বাবু বলেন, তার জানামতে তার ভাইয়ের সঙ্গে আরো চার যুবকের পাসপোর্ট আটকে তাদেরও জিম্মি করে রেখেছে বাহার ও মিজান।

আরো টাকা না দিলে জিম্মিদের তারা সিরিয়ায় আইএস বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দেবে বলে জিম্মিকারীরা হুমকিও দেয়। বাহারাইনে আটকে পড়া বেল্লাল হোসেন গত রোববার ফোনে জানান, তাকেসহ আরো বেশ কয়েকজন যুবকের পাসপোর্ট বাহার, মিজান ও তার লোকজন আটকে রেখেছে। ২০১৬ সালের ৫ই এপ্রিল তাদের বাহারাইন পাঠানো হয়। পাসপোর্ট ফেরত চাইলে আরো ২ লাখ টাকা করে দাবি করা হয়। পাসপোর্ট না থাকায় তারা দেশেও ফিরতে পারছেন না।

বেল্লাল দুঃখ করে বলেন অনেক টাকা দিয়েও তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না। গত ২রা আগস্ট মূল পাচারকারী বাহার ও মিজানের প্রতিনিধি হয়ে আইকো ইন্টারন্যাশনালের মালিক জনৈক বেল্লাল হোসেন ভুট্টুর সঙ্গে হোটেল প্যারাডাইসে বসে উভয় পক্ষের মধ্যে একটা সমাঝোতার সিদ্বান্ত হলেও পরে তারা সমাঝোতার সিদ্ধান্তকেও এড়িয়ে যায়। উল্টো তারা গত ১৭ই আগস্ট কোর্টে আমাদের বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলা করে। গত ১০ই সেপ্টেম্বর আমরা নোয়াখালী পুলিশ সুপার ইলিয়াছ শরীফকে ঘটনাগুলো অবহিত করি। এসপি নোয়াখালী ডিবি পুলিশকে তদন্ত করার নির্দেশও দেয়। এসপির সঙ্গে দেখা করার ঘটনায় তারা আরো ক্ষুব্ধ হয়ে গত ১৫ই সেপ্টেম্বর আবারো ৫ লাখ টাকার একটি মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলার আভিযোগ করেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানায়।

প্রবাসে এমনি এক যুবকের কান্নার ভিডিও দেখুন এখানে