উৎকোচ নিয়ে বিপাকে নেতা! বাড়িতে বিষের বোতল হাতে চাকুরি বঞ্চিত নারীর হানা !

কামরুল হাসান, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধিঃ

চাকুরি নিশ্চিত পাবার গ্যারান্টি নিয়েই জমিজমা বেঁচে চাকুরির প্রত্যাশায় মোটা অংকের টাকা তুলে দিয়েছিলেন নেতার হাতে। এবার চাকুরি হবেই! এমন আশায় বুক বেধেছিলেন দম্পত্তি। তবে শেষ অবধি সে আশায় গুড়েবালি !
গ্রুপিং-লবিঙয়ে পড়ে প্রত্যাশিত সোনার হরিন দেয়নি ধরা। একদিকে চাকুরি না পাওয়ার কষ্ট অন্যদিকে নেতার হাতে তুলে দেয়া টাকা ফেরত না পাওয়ার আশংকা মাথায় বিষের বোতল হাতে চাকুরি প্রত্যাশিত ঐ নারী উপস্থিত হন নেতার বাড়িতে। আর এই ঘটনার পরই ‘উতকোচ’ নিয়ে বিপাকে পড়ে যান নেতা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক রুবেল চাকরির জন্য সুরাইয়া নামে এক নারীর কাছে ৭ লাখ টাকা নিয়েও চাকরি না দেয়ার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে এলাকাজুড়েই।

অভিযোগ উঠেছে, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারন সম্পাদক গোলাম ফারুক রুবেল গড়েয়া ডিগ্রি কলেজর ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি হওয়ায় সেখানে শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য করেছেন । এছাড়া ঠাকুরগাঁওয়-১ আসনের এমপি রমেশ চন্দ্র সেন ও তার আস্তাভাজন লোকজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দাপ্তরিক পদ ও অন্যান্য স্কুল কলেজে নিয়োগের মোটা অংকের টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে বেশ কজন ভোক্তভুগির ।

ঘটনাসুত্রে জানা যায়, সুরাইয়া বেগম একজন শিক্ষিত নারী। পড়াশুনা শেষে বাবা বিয়ে দেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গড়েয়া মুন্সিপাড়া এলাকার আব্দুল কাদেরের সাথে। স্বামী আব্দুল কাদের একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। স্ত্রী শিক্ষিত হওয়ায় ইচ্ছে ছিল কোন একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করার। হঠাৎ শুনে গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক শূণ্যপদে একজন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। তাই আব্দুল কাদের স্ত্রী সুরাইয়াকে ওই পদে নিয়োগের বিভিন্ন মাধ্যম খুঁজে বের করা চেষ্টা করেন।

ভোক্তভুগির অভিযোগ, কোন এক মাধ্যমে গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক রুবেলকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে স্ত্রীকে ওই পদে নিয়োগের জন্য। বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি ওই পদের জন্য আব্দুল কাদেরের কাছে ৭ লক্ষ টাকা দাবি করেন। চাকুরির আশ্বাস প্রদান করলে আব্দুল কাদের সভপতি গোলাম ফারুক রুবেলকে ৭ লক্ষ টাকা অগ্রিম প্রদান করেন।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক ও এমএলএস শূণ্যপদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে গ্রন্থাগারিক পদে এমপি রমেশ চন্দ্র সেনের প্রার্থী উজ্জল হোসেনকে নিয়োগ প্রদান করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যজনকে নিয়োগ দেওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ে আব্দুল কাদের ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমসহ অন্যান্য প্রার্থীরা। ওইদিন স্কুল ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি চাকুরী না দিতে পারায় সুরাইয়কে অর্ধেক টাকা প্রদান করেন। বাকি টাকা পরে দিবেন বলে জানিয়ে দেন।

গত ২৮ তারিখ সকালে সুরাইয়া বেগম গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক রুবেলের বাড়িতে চাকুরীর জন্য বাকী উৎকোচের টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য চলে আসেন বিষের বোতল হাতে নিয়ে। এ সময় কিছুটা বাকবিতন্ডা হলে সভাপতি সুরাইয়াকে কয়েকদিন পর টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে বিদায় জানান।

জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক ও এমএলএস পদে নিয়োগ আবেদনের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়। সেই প্রেক্ষিতে গ্রন্থাগারিক পদে ১২ জন ও এমএলএস পদে ৯ জন আবেদন করেন। স্কুল ম্যানিজিং কমিটি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ওই দুই পদে নিয়োগ প্রদানের কথা বলে অনেক প্রার্থীর কাছে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু সেই সকল প্রার্থীদের নিয়োগ না দিয়ে প্রধান শিক্ষক ও এমপি’র পছন্দের লোককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক ও এমএলএস শূণ্যপদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ঠাকুরগাঁও স্থানীয় এমপি রমেশ চন্দ্র সেন নিজেই উপস্থিত থেকে প্রার্থীদের পরীক্ষা নেন। পরে গ্রস্থাগারিক পদে উজ্জল হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে চূড়ান্ত করা হয়।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রার্থী জানান, গ্রস্থাগারিক ও এমএলএস পদের জন্য চাকুরি দেওয়ার নামে স্কুল কমিটি অনেক জনের কাছে ৮-১০ লক্ষ টাকা নেয় অগ্রিম নেয়। কিন্তু কারো চাকুরি দিতে পারেনি। আরো বেশি টাকার বিনিময়ে এমপি সাহেব, ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি রুবেল ও প্রধান শিক্ষকের মতামতে ওই দুই পদে নিয়োগ দিয়েছেন অন্যজনকে। আমরা অনেকেই জমি জায়গা, গরু, বাছুর বিক্রি করে চাকুরির আশায় টাকা দিয়েছিলাম স্কুল কমিটিকে। আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গেছি।

গ্রস্থাগারিক প্রার্থী সুরাইয়া বেগম ও তার স্বামী আব্দুল কাদের জানান, ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের বড় নেতা রুবেল ভাইয়াকে তার কথা মত ৭ লক্ষ টাকা প্রদান করেছিলাম। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন চাকুরিটা হবেই। কিন্তু অন্যজনের কাছে বেশি টাকা নিয়ে এমপি, প্রধান শিক্ষক ও উনি নিয়োগ চূড়ান্ত করেছেন। অগ্রিম টাকা সভাপতি অর্ধেক ফেরত দিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, বাকী টাকা দিতে টালবাহানা শুরু করলে আমার স্ত্রী উনার বাড়িতে বিষের বোতল নিয়ে গিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেছেন। বাকি অর্ধেক টাকা ২ অক্টোবর দিবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রস্থাগারিক পদে নতুন নিয়োগ প্রাপ্ত উজ্জলের কাছে টাকা প্রদারে বিষয়ে জানতে চাইলে সে জানায় স্কুলের উন্নয়নের জন্য স্কুল ফান্ডে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে বলে স্বীকার করেন।

গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওহিদুল ইসলাম সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, এমপি সাহেবের উপস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। তারপরে নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। অনেকজনের কাছে টাকা নিয়েছেন এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন কারো কাছে কোন টাকা নেওয়া হয় নাই। এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন।

গড়েয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক রুবেল জানান, টাকার বিনিময়ে কোন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। মেধার ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। চাকুরী দেওয়ার নামে সুরাইয়া বেগমের কাছে টাকা নেওয়ার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন আবেগের বশে কেও কিছু বললে তা তো আর সত্য নয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার মোশারফ হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, সকলের উপস্থিতিতে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার প্রার্থীকে চূড়ান্ত করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে নিজের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এমপি রমেশ চন্দ্র সেন সাংবাদিকদের জানান, নিয়োগ পরীক্ষায় আমি উপস্থিত থেকে স্বচ্ছ ভাবে মেধার মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। কেউ যদি চাকুরীর জন্য অন্য কাউকে টাকা দিয়ে থাকেন সেটি ভুল করেছেন।