পঙ্গু বোনের জন্য দুই রোহিঙ্গা ভাইয়ের ব্যতিক্রমি ভালবাসার হৃদয় ছোয়া এক গল্প!

কক্সবাজার থেকে,তামিরুল ইসলাম মিল্লাত।।

জোনাইদ ও আমির হাকিম দুই ভাই। বয়স যথাক্রমে ২১ ও ২৪। ঘর্মাক্ত শরীরে বাংলাদেশে ঢুকে তাদের ক্লান্ত মনে হলনা।
কাছে গিয়ে দেখা গেল তাদের দু’জনের কাঁধে বাঁশে ঝুলানো বস্তায় এক মহিলা। জিজ্ঞেস করে জানা গেল মহিলা তাদের দুইজনের বড় বোন ছেনোয়ারা বেগম।

২৫ অক্টোবর মিয়ানমারে শুরু হওয়া জাতিগত সহিংসার পর থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ শুরু হওয়ার ধারাবাহিকতায় তারাও প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে।

আমির হাকিম বার বার নিজের কপালের ঘাম মুছছিল,যেন অতীতের দুঃখ সব মুছে দূর করতে চায়। কি রকম দুঃখ জিজ্ঞেস করতেই কথা বলা শুরু করল ছোট ভাই জোনাইদ। অপলক দৃষ্টিতে যেন কথাই গিলছিল বোন ছেনোয়ারা।

মিয়ানমারের বুছিডং থানার চৌপ্রাং গ্রামের বাসিদ্ধা ছিল তারা। সহিংসতা শুরুর পর তাদেরই চোখের সামনে হত্যা করা হয় মা-বাবা কে। ঘটনাক্রমে বেঁচে যান তারা ভাই বোন তিনজন। দুই ভাই স্বাভাবিক হলেও তাদের একমাত্র আদরের বোন একজন প্রতিবন্ধী। দুই পায়ে চলাচল করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে আজ থেকে ৯ বছর আগে। এ কথাই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন আমির হাকিম, ‘জন্মত্তু আরার বইন লুলা নোআইস্সিল। গত ন বছর ধরি আড়ি ন পারেদ্দে আরার আদরর বইন’।

অনুবাদ হবে, ‘ জন্ম থেকে আমাদের বোন প্রতিবন্ধী ছিলনা। গত ৯ বছর ধরে হাটতে পারেনা আমাদের আদরের বোন’।

বাংলাদেশে প্রবেশকালে তাদের ব্রিজঢালা নামক বড় পাহাড়টি পাড়ি দিতে হয়েছে। অতিক্রম করতে হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। এতো কষ্টেও প্রতিবন্ধী বোনকে তাদের বোঝা মনে হয়নি। সাথে নিয়ে আসেনি কোন প্রয়োজনীয় মালামাল। রক্তের বাঁধন তাদের পৃথক করতে পারেনি। ভাই বোনের এ বন্ধন ও দৃশ্য সীমান্ত নগরী টেকনাফের মানুষকে ক্ষনিকের জন্য হলেও হৃদয় ছুঁয়েছে।

ছোট ভাই জোনাইদ বর্ণনা দিল দীর্ঘ পথ পাঁড়ি দেয়ার কাহিনী, ‘বইনরে লই ৫ দিন পন পাড়ত্ ঘুইজ্জি। আইট্টি লাম্বা পথ।লুলা বইনরে পুঝা ন লাগে’।

অনুবাদ হবে, ‘বোনকে কাঁধে করে ৫ দিন ধরে পাহাড়ী পথ, গ্রামের পর গ্রাম হেঁটেছি। প্রতিবন্ধী বোনকে বোঝা মনে করিনি’।

নদী কিভাবে পার হল জিজ্ঞেস করতেই জানাল, ‘নাফ নদী হয়ে নাইট্যংপাড়া সীমান্ত দিয়ে অনেক কষ্টে এপারে আসতে সক্ষম হয়েছি। ঘাটের মাঝিকে প্রতিবন্ধী বোনের জন্য ৪০ হাজার কিয়াট দিতে হয়েছে’।

অবশেষে বাংলাদেশে এসে পৌঁছাতে পারাই এখন তাদের কাছে স্বস্তির কারণ। হাজারো কষ্ট বুকে ধারণ করা থাকলেও ভাইবোন একসাথে এখনো আছে এটাই এখন তাদের কাছে অনেক কিছু। টেকনাফ স্টেশনে এসে বোনকে কাঁধ থেকে নামাল দু’জন। এবার তাদের সংগ্রাম হবে মাথা গুজে থাকার জন্য কোন এক জায়গার খোজ করতে হবে কোন এক রোহিঙ্গা বস্তির কোন এক কোণা।

বিকালের সূর্য তখন ডুবতে শুরু করেছে। ডুবন্ত সূর্যের আবছা রঙিন আলোয় তাদের চেহারাগুলোকে আরো মলিন মনে হল। ভাই বোন কি যেন ফিসফিস করছিল নিজেদের মধ্যে। হয়ত বলছে, সবকিছু ছাঁপিয়ে ভাইবোনের ভ্রাতৃত্বের বাঁধনের জয় হল যেন তাদের দেখে।