মাছ শিকারের এক মরণ ফাঁদ ‘দাড়কী’

আব্দুল করিম সরকার, পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:

বাঁশ আর পাট বা সুতলী দিয়ে তৈরী মাছ শিকারের এক মরণ ফাঁদ বা হাতিয়ারের নাম দাড়কী বা খলসাজানী। এলাকা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত এই দাড়কী। প্রাচীন কাল থেকেই মাছ ধরার একটি বিশেষ ফাঁদ বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শুধু জেলেরাই নয়, গ্রামীন জনপদের সাধারণ মানুষও মাছ শিকারে দাড়কী ব্যবহার করে থাকেন। এক সময় দাড়কীর খুব কদর ছিলো। দিন বদলের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা চেতনারও বদল হয়েছে। আর দাড়কীর স্থান বহুরুপী ব্যবহারে অনেকটা দখল করেছে নেট বা জাল। বর্তমানে সল্প সংখ্যক পরিবারের লোকজন বংশানুক্রমে দাড়কী শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে।

দাড়কীর চাহিদা বেশী নদী নালা, খাল বিল এলাকায়। এসব এলাকার জেলেরা ছাড়াও নিম্ন আয়ের অনেকেই নদীর ধারে দাড়কী বসিয়ে মাছ শিকার করে জীবীকা চালান। এ মাছ শিকার চলে বাংলা বছরের আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত। এই সময়ে কাজও কম থাকে। আর দাড়কী বসিয়ে মাছ শিকারে বেশী পরিশ্রম করতে হয়না। দিনের অন্যান্য কাজও সহসাই করা যায়। সন্ধ্যার আগে নদী নালা, ডোবার ধারে, জমির আইলে দাড়কী বসানো হয়। সারারাত মাছ দাড়কীর চোখ দিয়ে ভিতরে গিয়ে আটকা পড়ে। পর দিন সকালে তা উঠানো হয়।

এরপর মাছের কপালে যা হবার তাই হয়ে থাকে। দাড়কীর ভিতরে মাছ প্রবেশর রাস্তাকে বলা চোখ হয়। দাড়কী আবার এক চোখা ও দুই চোখা আছে। যে দাড়কীর শুধু এক পাশে চোখ থাকে সেটাকে ১ চোখা,আবার কোন দাড়কীর দু’পাশে চোখ থাকে সেটাকে দো-চোখা দাড়কী বলা হয়। আগেরকার দিনে গ্রামের ছেলেরা সন্ধ্যার আগে দলবেধে নদীতে দাড়কী বসাতো। আর দাড়কীসহ মাছ চুরি ঠেকাতে পালাক্রমে পাহারাও দিত রাত জেগে। আবহমান বাংলার লোকজ হস্তশিল্পের অংশ বিশেষ এ দাড়কী। প্রাচীনকাল থেকে গ্রামাঞ্চলের নিম্ন আয়ভুক্ত মানুষেরা দাড়কী বানিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।

বাড়িতে নারীরাই সাধারণত: দাড়কী বানানোর কাজ করে থাকেন। অলস সময়ে পুরুষরাও দাড়কী বানানো কাজে বাড়ীর নারীদেরকে সহায়তা করেন।এ ছাড়াও তাঁরা দাড়কী বানানোর উপকরণ যেমন-বাঁশ, সুতলীসহ অন্যান্য সামগ্রী এনে দেয়ার পর বানানো দাড়কী বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রিও করেন। দিন বদলের সাথে সাথে দাড়কীর উৎপাদন ও ব্যবহার অনেকটা কমে এসেছে। বর্তমানে বংশানুক্রমে এ পেশা ধরে আছে স্বল্প সংখ্যক পরিবার। এমনি এক পরিবারের সদস্য ফুলবাবু মিয়া। তার বাড়ী পীরগঞ্জ উপজেলার বড় আলমপুর ইউনিয়নের তাতারপুর গ্রামে। ওই গ্রামের মৃত আব্দুল লতিব তার বাবা।

গত শুক্রবার দুপুরে চতরা হাটের দাড়কী হাটিতে দাড়কী বিক্রির সময় কথা হয় তার সাথে। ফুলবাবু মিয়া জানালেন, বাপ দাদারা দাড়কী তৈরী ছাড়াও অন্যের কাছ থেকে দাড়কী কিনে ব্যবসা করতেন। একই কাজ তিনিও করছেন। তাঁর মা হাজেরা বেওয়া। এখনও দাড়কী বানানোর কাজ করেন। স্ত্রী রেখা বেগম ও স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়েরাও দাড়কী বানাতে পারে।

ফুল বাবু মিয়া আরও বলেন, বছরে ৪/৫ মাস অর্থাৎ আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত দাড়কীর কারবার চলে। যে হারে দাড়কী বানানোর উপকরনের দাম বেড়েছে, সেহারে দাম বাড়েনি দাড়কীর। এখন আর আগের মতো দাড়কী বিক্রিও হয়না , পোশায়ও না। ধরে আছি, বাপ-দাদার পেশাতো তাই।