কোটালীপাড়ায় ঐতিহ্যবাহী বিল বাঘিয়ার ৩ দিনব্যাপি নৌকা বাইচ শুরু

এইচ এম মেহেদী হাসানাত,গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় লক্ষীপূজা উপলক্ষ্যে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও সু-প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যে লালিত আড়াইশ বছরেরও অধিক সময় আবহমান গ্রাম বাংলার অতি প্রাচীন কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও নিজস্বতা ধরে রাখতে কোটালীপাড়া উপজেলার কালিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন বাঘিয়ার বিলের দু’কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এ বাইচ চলবে আগামীকাল রোববার পর্যন্ত।

শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে শুরু হওয়া এ নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতায় গোপালগঞ্জসহ মাদারীপুর, পিরোজপুর, নড়াইল, বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের অর্ধশতাধিক সরেঙ্গা, সিপ, বাছারী ও কোষা নৌকা অংশ নেয়। ঠিকারি এবং কাশির বাদ্যের তালে তালে জারি ও সারি গান গেয়ে নেচে নেচে নৌকাবাইচে অংশ নেন মাল্লারা। নানা বর্ণে ও বিচিত্র সাজে দৃষ্টিনন্দন এসব নৌকার তুমুল বাইচ হয়। চলে একের পর এক কুচ। শান্ত জলাশয় নেচে উঠে অথৈ তালে। প্রতিদিন বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কালিগঞ্জ বাজার থেকে বুরুয়া ব্রীজ হয়ে খেজুরবাড়ী পর্যন্ত চলবে এ নৌকাবাইচ। তবে এ বাইচে কোন প্রাইজ দেওয়া না হলেও মাল্লারা নিজ উদ্দ্যেগে এ বাইচে অংশ নেন। তবে প্রতিযোগিতার প্রধান আকর্ষন ছিল মহিলাদের বাচারী নৌকা। বেশ কয়েকটি নৌকা নিয়ে পুরুষেদের সাথে সমান তালে প্রতিযোগীতায় অংশ নেন মহিলা মাল্লারা।

এ নৌকা বাইচে মানুষের সার্বিক অংশগ্রহণ ও আনন্দ উচ্ছাস ছিল উপভোগ করার মতো। বাইচ শুরু হবার আগেই খালের দু’পাড়ে জড়ো হয় লাখো দর্শক। গ্রামের লোকজন উৎসাহ দিতে নানা ধরণের নৌকা সাজিয়ে মাইক বেধে অবস্থান নেন নদীর দু’কুলে। করতালি, হর্ষধ্বনি, নৌকাবাইচের লোকজ গান, বাদ্য বাজনায় মুখরিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।

এলাকার মানুষ বছরের এই একটি আনন্দঘন দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকে। জামাই-মেয়ে, অতিথি, আত্মীয়-স্বজন এদিন ছুটে আসে এলাকায়। উপভোগ করে এ নৌকা বাইচ। মাতোয়ারা হয়ে উঠে উৎসবে। প্রায় সারা দিনই হিন্দু, মুসলিমসহ নানা ধর্ম ও বর্ণ সম্প্রদায়ের সম্মিলিত স্রোতধারা এ মেলা যেন পরিণত হয় সম্প্রীতির এক মিলন উৎসবে। এলাকার জনগণের মধ্যে এ বাইচ একটি চিরাচরিত কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।

এ নৌকা বাইচ উপলক্ষ্যে কোটালীপাড়া উপজেলার কালিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন বাঘিয়ার বিলের দু’কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসে মেলা। দেশীয় কুটির শিল্প, মিষ্টি-মন্ডা, পান-সুপারির কেনাবেচা হয়। এছাড়া খালের মধ্যেও বসে ভাসমান নৌকার মেলা। নৌকা সাজিয়ে ও ট্রলারে করে মেলায় দর্শনার্থীরা আসে দূর দূরান্ত থেকে। এ মেলা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নেন দর্শনার্থীরা।

দর্শনার্থীরা জানায়, আন্দন উপভোগ করতে সপরিবারে তারা এ নৌকা বাইচ দেখতে আসেন। তবে খালটি আস্তে আস্তে ভরাট হয়ে যাওয়ায় আর আগের মত দৃষ্টিনন্দন বাইচ হচ্ছে না। তারা দ্রুত এ খালটি খননের দাবী জানিয়েছেন।

কলাবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান ও আয়োজক মাইকেল ওঝা জানান, এ নৌকা বাইচে কোন প্রাইজ দেওয়া না হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নৌকা এ বাইচে অংশ নেয়। তবে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতার আয়োজন করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। দ্রুত খালটি খনন করা জন্য সরকারে কাছে দাবী জানান তিনি।

কোটালীপাড়া থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুল ফারুক জানান, কোটালীপাড়া উপজেলার বাঘিয়ার বিলের নৌকাবাইচ আমাদের কৃষ্টি কালচার। গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ নৌকাবাইচ উপভোগ করতে এখানে আসে। পরিনিত হয় মিলন মেলায়। যে কারনে দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নৌকাবাইচ এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নৌকা বাইচ নির্বিঘ্নে শেষ করতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।