কামরাঙ্গীরচরে গ্যাস বন্ধ, চরম ভোগান্তি

Dhaka news
❏ সোমবার, মে ১৬, ২০২২ ঢাকা

মাসুম পারভেজ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট : অবৈধ ব্যবহারকারিদের শায়েস্তা করতে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের গোটা এলাকাতেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। গত ১০ মে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে কামরাঙ্গীরচরের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

সোমবার (১৬ মে) সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস না থাকায় হাজার হাজার নারী ও শিশুরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা হোটেল বা দোকানে গিয়ে খাবার খেলেও বাড়িতে নারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জোনের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা জানান, বারবার এসব গ্রাহককে সতর্ক করেও কোন কাজ হচ্ছিল না। কাজ হচ্ছিল না বছরের পর বছর অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেও। তাই এবার অবৈধ গ্রাহকদের শায়েস্তা করতেই এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, আবাসিক, শিল্প এবং বাণিজ্যিক মিলিয়ে তিতাসের বৈধ গ্রাহক ১২ হাজার। অথচ সংযোগ ব্যবহার করছেন এক লাখেরও বেশি গ্রাহক। অর্থাৎ প্রায় ৯০ হাজার গ্রাহক অবৈধভাবে সংযোগ নিয়েছে। এছাড়া বৈধ গ্রাহকদের কাছেও বড় অংকের বিল বকেয়া রয়েছে। প্রায় ৬৭ কোটি টাকা বকেয়া বিল পড়ে আছে। এতে সরকারের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে গ্যাস সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।

বৈধ গ্যাস ব্যবহারকারি রাসেল চৌধুরী বলেন, লাইনে গ্যাসের চাপ প্রায় সময়ই কম থাকে। কিন্তু আমরা তাও নিয়মিত বিল পরিশোধ করি। কিন্তু কোন ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়া হুট করে তিতাসের পুরো এলাকার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা কোনভাবেই ঠিক হয়নি। জাওচর, আবু সাইয়িদের বাজার, আহসান নগর, রনি মার্কেটসহ কোনও এলাকায় এখন গ্যাস নেই। ভোগান্তি দেখারও কেউ নেই। অবৈধদের শায়েস্তা করতে গিয়ে সবাইকে শাস্তি দেয়াকে কা-জ্ঞানহীন বলেছেন তিনি। পূর্ব রসুলপুর এলাকার বাসিন্দা দিদার হোসেন বলেন, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে হুট করে কোন ঘোষণা ছাড়াই লাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তিতাস। কোন কিছু না বুঝে আমরা তিতাসের অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন করি। কিন্তু তারাও কিছু বলতে পারে না। কবে নাগাদ চালু হবে তাও কেউ জানে না। দুপুরে পরিবার নিয়ে কেরানীগঞ্জের এক আত্মীয় বাড়িতে গিয়ে খেয়ে আসছি। কিন্তু প্রতিদিন কি এটা সম্ভব। নিয়মিত বিল পরিশোধ করেন সাহাবুদ্দিন নামে এক গ্রাহক বলেন, আমরা বছরে ৭২ হাজার টাকা বিল দেই। কিন্তু যারা বিল না দিয়ে অবৈধভাবে বছরের পর ব্যবহার করে তারা ৫ বছরে ১০ হাজার টাকা বিল দেয়। যারা লাইন কাটতে আসে তাদের ম্যানেজ করতেই এই টাকা দেয় তারা। আর এই টাকা নিয়ে রাইজারটা নিয়ে জমা না দিয়ে সমঝোতা করে তিতাসের লোকজন। ফলে আমরা দেখছি অবৈধ লাইনের লোকজনই ভালো আছে। এক একদিন লাইন কাটতে এসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা নিয়ে চলে যায় তিতাসের কর্মীরা। মাঝখান থেকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে আমাদের মতো বৈধ সংযোগ গ্রহণকারীদের। যারা নিয়মিত বিল পরিশোধ করে আসছি।

যদি গ্রাহকদের কাছে বকেয়া পাওয়া থাকে তাহলে তাদের নোটিস দিয়ে একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে পারত তিতাস এমনটা উল্লেখ করে ৫৬নং ওয়ার্ডের কমিশনার মোহাম্মদ হোসেন বলেন, তিতাসের এই সিদ্ধান্তের ফলে সব শ্রেণীর মানুষদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

ঝাউলাহাটির বাসিন্দা বাবুল মিয়া বলেন, এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস নেই। খাওয়া দাওয়ার সমস্যা বলে বোঝানো যাবে না। সকালে রুটি, দুপুরে পাউরুটি কিংবা মাঝে মাঝে অন্য কিছু খেয়ে দিন কাটছে। পরিবারে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব সমস্যায় পড়েছি। তাদের তো এটা সেটা রান্না করে খাওয়াতে হয়। কিন্তু এখন সেটা পারছি না। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, গত মাসেও গ্যাস বিল দিয়ে আসলাম। অথচ এখন গ্যাস নেই। কবে গ্যাস পাবো, সেটারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কামরাঙ্গীরচরের ঝাউচরে নিজের বাসায় রান্নার দুর্ভোগের কথা জানালেন ফরিদা বেগম। তিনি বলেন, ইটের চুলায় লাকড়ি দিয়ে পরিবারের ৮ সদস্যের প্রতিদিন দুই বেলা রান্না করা খুব কষ্টকর। আবার বাজারে লাকড়িও পাওয়া যাচ্ছে না। আগে এক মণ লাকড়ি ছিল ২০০ টাকা। এখন সেটি ২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে লাকড়ি দিয়ে রান্না করলে অনেক ধোঁয়াও হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে স্থানীয় প্রভাবশালীরা বেশি খুশি হন। সবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারাই আবার প্রশাসনের সহযোগিতায় নতুন গ্যাস সংযোগ দিয়ে যান। আমরা এখানে কিছু বলতে গেলেই নানা সমস্যায় পড়ি। এমনকি হামলার শিকারও হতে পারি। তাই সেভাবে কেউ কিছু বলি না।

অন্যদিকে, গ্যাস সংযোগ না থাকায় এলাকায় খাবারের দাম বেড়েছে বলেও জানিয়েছেন অনেকে। হোটেলগুলোতে পাঁচ টাকার পরোটা বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়। আবার যেখানে আগে ১০ টাকার ভাত পাওয়া যেতো, সেখানে এখন ২০ টাকার নিচে ভাত কেনা যাচ্ছে না।

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদ মোল্লাহ্ বলেন, অবৈধ সংযোগের পাশাপাশি সেখানে বৈধ গ্রাহকদের কাছেই আমাদের বকেয়া আছে ৬৭ কোটি টাকার বেশি। এমন তো চলতে পারে না। রাষ্ট্রের কত কত রাজস্ব এর ফলে বাদ পড়ছে। আমরা বারবার তাদের কাছে গিয়েছি, কথা বলেছি, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নিতেই হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যেহেতু উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেহেতু সমাধান হতেও একটু সময় লাগবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে বকেয়া আদায়, অবৈধ সংযোগ বন্ধের প্রতিশ্রুতি পেলে আমরা ভেবে দেখব।