দ্বিমুখী চাপে মালয়েশিয়ার মন্ত্রী , মহাসংকটে কলিং ভিসার ভবিষ্যৎ

Malaysia-Kuala-Lumpur
❏ মঙ্গলবার, জুন ২১, ২০২২ প্রবাসের কথা

আশরাফুল মামুন, মালয়েশিয়া প্রতিনিধি: গত ৪ বছর আগে সিন্ডিকেটের অভিযোগে মাহাথির সরকার কলিং ভিসা স্থগিত হওয়ার পর একের পর এক জটিলতায় ঝুলে আছে অন্যতম শ্রমবাজার টি। কলিং খুলে শ্রম বাজার স্বাভাবিক করনে, এই ৪ বছরে অসংখ্যা মেইল, মিটিং ও দেন দরবার হয়েছে কিন্তু ফলাফল যেই লাউ সেই কদূ।

এ অচলাবস্থা চলতে থাকলে কলিং যেমন বন্ধ হয়ে যেতে পারে আবার চালু হলেও আগের মতই মহাসংকটে পড়তে পারে কলিং। যেভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল ২০০৭ এ চালু হওয়া কলিং ভিসার। অবৈধ হয়ে মানবিক সংকট  পড়তে পারেন সাধারণ কর্মীরা। কলিং নিয়ে এক কদম এগিয়ে আসলে আবার নতুন জটিলতায় ২ কদম পিছিয়ে যায়। সিন্ডিকেট নিয়ে বাংলাদেশেরের তীব্র আপত্তি যেমন মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী এম সারাভানা কোন কর্নপাত করছেন না ঠিক তেমনি মালয়েশিয়ার নিয়োগ কর্তাদের সিন্ডিকেট বিরোধী বক্তব্য ও কোন পাত্তাই দিচ্ছে না।

মাহাথির সরকারের পর ২ দফায় দেশটির সরকারের পালাবদল হয়েছে।  সারাভানান ক্ষমতায় আসার পর দফায় দফায় কলিং বিষয়ে নিজ দেশেই তীব্র সমালোচনা ও তোপের মুখে পড়ছেন।  দেশটির এনজিও, মানবাধিকার সংস্থা ও জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনার আক্রান্ত হচ্ছেন।  তাদের প্রশ্ন বাংলাদেশ থেকে উম্মুক্ত পদ্ধতি তে ১৫২০ এজেন্সি থেকে শ্রমিক আমদানি না করে কেন শুধু  ২৫ এজেন্সি থেকে শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে?

তবে এত আলোচনা সমালোচনার পরও নিজের অবস্থানে অনড় সারাভানান। সর্বশেষ গতকাল দেশটির অন্যতম রাজ্য সাবাহ এর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হ্যারিস সালেহ এক বিবৃতিতে বলেছেন, অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণকে একটি ‘মুর্খ ধারণা’ এই কথাটি বলার জন্য এম সারাভানানের পদত্যাগ করা উচিত।

গত সপ্তাহে দেশটির শিল্প কারখানার মন্ত্রী জুরাইদা কামরান বলেছেন,  বাংলাদেশ থেকে কলিং ভিসায় শ্রমিক না নিয়ে পাকিস্তান থেকে শ্রমিক নেওয়ার জন্য।

মাসখানেক আগেও কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে দেশটির এনজিও সংস্থা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিলে নিজ দেশের লোকজন কাজ পাবেন না। কিন্তু ঐ এনজিও এর দাবি অবাস্তব ও ভিত্তিহীন।  কারণ পাম তেল ও কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে শ্রমিকের অভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।  এসব সেক্টরে শুধুমাত্র অভিবাসীরা শ্রমিকরা কাজ করেন।  মালয়েশিয়ানরা এসব সেক্টরে কাজ করতে পারে না।

বাংলাদেশে ২ জুন জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিং এর আগে ঢাকায় যাওয়ার আগে সারাভানান হুমকি দিয়েছিলেন যদি ঢাকায় তার সামনে বিক্ষোভ করে তাহলে এজেন্সির সংখ্যা আরো কমিয়ে দেওয়া হবে। পরে সিন্ডিকেট বিরোধীরা একটি মানববন্ধন করেছেন। গত পড়শো দিন এম সারাভানান ২৫ টি এজেন্সি বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠাবে এই মর্মে একটি বিবৃতি বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়েছে। সেখানে তিনি উল্লেখ্য করেছেন ঐ ২৫ এজেন্সি নিয়োগ দিবেন আরো ২৫০ সাব এজেন্সি। এই ২৫০ এজেন্সি ২৫  এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাবে। প্রথমে বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে সিন্ডিকেট এর বিরোধিতা করলেও এখন নিরব। কারণ সারাভানান সাফ জানিয়ে দিলেন কোন কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাবে সেটা নির্ধারন করবে আমার দেশের নিয়োগ কর্তা। যদিও ২৫ এজেন্সি নির্বাচনে সারাভানান নিয়োগকর্তাদের মতামত নেন নি।

কলিং ভিসায় মোট খরচ কত পড়বে সেটা এখনো অজানা।  এদিকে প্রবাসী কল্যান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ বার বার বলছেন,  খরচ ১ লাখ ৬০ এর বেশি হবে না।  কিন্তু মন্ত্রীর এই খরচের সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই।  কারণ আগের কলিং ভিসায়  ৪০ হাজার খরচ সরকারিভাবে নির্ধারণ করলেও একজন কর্মী গুনতে হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। খোদ মালয়েশিয়ার নিয়োগ কর্তারা বলছেন করোনা মহামারীর কারণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে এই মুহুর্তে ভর্তুকি দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কর্মী আমদানি সম্ভব নয়।  তারা বলছেন বিমান টিকিট ও অভিবাসন ব্যয় আমাদের বহন করা সম্ভব না। তবে মালয়েশিয়া তে শ্রম বাজারের সংশ্লিষ্ট সকলেই বলছেন,  সিন্ডিকেট হলে আগের থেকেও বেশি খরচ পড়বে শ্রমিকদের। আনুমানিক প্রায় ৪ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর এই খরচ তুলতে গিয়েই শ্রমিকেরা আগের মত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অবৈধ হয়ে যাবে।

সম্প্রতি নিয়োগ কর্তাদের একটি সংগঠন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল কুয়ালালামপুর এ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আমরা ২৫ কিংবা ২৫০ এজেন্সির মাধ্যমে নয় বাংলাদেশের সব বৈধ এজেন্সি থেকে কর্মী আমদানি করতে চাই ।  তাদের যুক্তি হলো,  ২০০৭-৮ সালে চালু হওয়া কলিং ভিসায় ১০ সিন্ডিকেট এর  মাধ্যমে কর্মী প্রতি সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।  যার ফলে ১ জন কর্মী মালয়েশিয়া এসে দেখে তার কোম্পানি তে সব কর্মীর কাজ নেই।  আবার কাজ থাকলেও বেতন এতই কম যে খরচের  সাড়ে ৩ লাখ টাকা সাড়ে ৩ বছরেও উসূল করা সম্ভব না।  তখন বাধ্য হয়ে পালিয়ে গিয়ে অবৈধ হয়ে অন্য কোম্পানি তে  কাজ করে অথবা বাধ্য হয়ে নিজ দেশে ফিরে গেছে।  এতে করে সরকার ও কর্মী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু লাভবান থেকে যায় মধ্যস্বত্ত ভোগী রিক্রুটিং এজেন্সি গুলো।