🕓 সংবাদ শিরোনাম

গত ২৪ ঘন্টায় করোনায় কেউ মারা যায়নি দেশে * মেয়েদের জমি লিখে দেওয়ার বিরোধে বাবার হাতে খুন হলেন ছেলে * মাইক্রোসফটের সঙ্গে ওয়ালটনের চুক্তি * গাজীপুরে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকীতে স্কুল ড্রেস বিতরণ * গত ২৪ ঘন্টায় দেশে ১২৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি * ‘আড্ডা প্রিয়’ স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে বলে অভিমানী স্ত্রীর আত্মহত্যা! * অভিনব কায়দায় প্রেমের ফাঁদে মোটরসাইকেল ছিনতাই, গ্রেপ্তার হলো তরুনী * বরগুনায় ছাত্রলীগ কর্মীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ: তদন্ত করবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ * ফরিদপুরে জুট মিলের রোলারে পিষ্ট হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু * ফরিদপুরে স্ত্রীর করা মামলায় পুলিশ কর্মকর্তার কারাদণ্ড *

  • আজ মঙ্গলবার, ১ ভাদ্র, ১৪২৯ ৷ ১৬ আগস্ট, ২০২২ ৷

স্বপ্ন বাঁধছে নতুন প্রত্যয়ে কেরানীগঞ্জের খামারিরা

Keranigonj news
❏ বৃহস্পতিবার, জুন ৩০, ২০২২ ঢাকা

মাসুম পারভেজ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: ঈদের দিন ঘনিয়ে আসায় শেষ মুহূর্তে কোরবানির গরুসহ অন্যান্য পশু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের খামারি ও কৃষকরা। ক্ষুদে প্রান্তিক থেকে ছোট বড় কৃষকরা যেমন দু-চারটা পশু নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন আবার বড় খামারিরাও বিগত দিনের লাভ-লোকসান খতিয়ে স্বপ্ন বাঁধছে নতুন প্রত্যয়ে। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু না আসলে হাটে গরুর ন্যায্য মূল্য পাবেন বলে আশা করছেন তারা।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কেরানীগঞ্জে ছোট বড় মিলিয়ে ৫৬২ পশুর খামারি রয়েছে। এসব খামারে ৪ হাজার ৯ শ’ ৩৬ টি ষাড়। ১ শ’ ৬৫ টি বলদ। ১ শ’ ৬৯টি গাভী ও ৯৪ টি মহিষসহ মোট ৫ হাজার ৮ শ’ ৩৪ টি গরু-মহিষ রয়েছে। এছাড়া ৩ শ’ ৫৯ টি বিভিন্ন জাতের ছাগল ও ১ শ’ ১১টি ভেড়া রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী এখানকার গরুখামারীদের মধ্যে রয়েছে আনোয়ার সিটি এগ্রোভেট, শরীফ এগ্রোভেট, আলম ডেইরী ফার্ম, সামায়রা এগ্রোভেট, শাহজালাল ডেইরি ফার্ম, আনোয়ার হোসেন, আলী আহম্মেদ ডেইরির নাম উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও উপজেলার জিনজিরা, শুভাঢ্যা, রাজেন্দ্রপুর, আব্দুল্লাহপুর, দঁড়িগাও, খোলামোড়া, নরুন্ডী, শাক্তা, আটি, কলাতিয়া, তারানগর ও হযরতপুর ইউনিয়নের অনেকেই কোরবানির পশু পালন করে নিজেরা কোরবানি দেয়ার পাশাপাশি ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিক্রি করে থাকেন। এসব পশু পালকদের গোয়ালে দেশীয় গরুর পাশাপাশি রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ বিভিন্ন দেশের গরু। এসব পশু পালকদের মধ্যে পেশাদার গরু ছাগল ব্যবসায়ীরা কোরবানির ৭-৮ মাস আগেই পছন্দের পশু ক্রয় করে যতেœর সাথে লালন পালন করে থাকেন। স্থানীয় এসব পশু পালকদের বেশির ভাগ কোরবানির পশুই নিজ নিজ গোয়াল থেকেই বিক্রি হয়। এছাড়া কেরানীগঞ্জের অভ্যন্তরীণ পশুর হাট এবং রাজধানীর নয়াবাজার, শ্যামপুর ও জুরাইনসহ বিভিন্ন হাটে বিক্রি হয়ে থাকে।

তবে স্থানীয় অনেকেই আগেভাগে তাদের পছন্দসই গরু কেনার পর ওই গোয়ালেই রেখে দেয় কোরবানীর আগ পর্যন্ত। এজন্য তারা অবশ্য পশুর খাবার খরচ ও রাখালের জন্যও কিছু খরচ বহন করে থাকে। যারা সাধারণত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পশু পালন করে তাদের প্রত্যেকেই ৪০ থেকে ৫০টি গরু পালন করে। এর বাইরেও তাদের অনেকেরই রয়েছে সারা বছরজুড়ে ডেইরি ফার্মের ব্যবসা। তাছাড়া কোরবানির পশু পালন একদিকে যেমন পরিশ্রমের কাজ অপরদিকে এ ব্যবসা অনেক ব্যয় বহুল বলেও জানান স্থানীয় পশুপালকরা। মোটামুটি একটু ভালো ও বড় সাইজের এক একটি ভারতীয় বার্মা কিংবা নেপালি গরুর দাম এক থেকে দুই লাখ টাকায় কিনতেই হয়। তারপর এদের লালন পালন খরচ মিটিয়ে পরে ব্যবসা।

ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শে কৃমিনাশকসহ নির্দিষ্ট রোগের ওষুধ খাওয়ানো হলেও ক্ষতিকর ইঞ্জেকশন ও ট্যাবলেট পরিহার করে সবুজ ঘাস ও খড়ের পাশাপাশি খৈল, গুড়া, ভুষি খাওয়ানোর মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে পশুগুলোকে। কোনও ভ্যাকসিন ছাড়াই প্রস্তুত করা হয়েছে দেশি, নেপালি, হারিয়ানা, অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিজিয়ামসহ নানা জাতের গরু। ফলে খামারি ও কৃষকদের এসব গরুতে কোনও ধরনের রোগ বালাইয়ের ঝুঁকিও নেই। এ কারণে বাজারে এই অঞ্চলের গরুর চাহিদাও অনেক বেশি বলেন জানান।

বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি খামারে চার পাঁচজন লোক নিয়মিত গরু-ছাগলগুলোকে খাবার দেওয়া ও গোসল করানোসহ বিভিন্ন পরিচর্যা করছেন। ভালো দাম পেতে আকর্ষনীয় করে গড়ে তুলছে পরম যতেœ পশুগুলোর দেখভাল করছেন খামারি ও কৃষকরা। পশুর খাদ্য তালিকাটাও বেশ সমৃদ্ধ।

উপজেলার আনোয়ার সিটি এগ্রোভেটের মালিক আনোয়ার হোসেন জানান, এ বছর তার ফার্মে দেড় শতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির গরু ও মহিষ রয়েছে। আমাদের পালিত পশুকে খৈল, ভূষি, কুড়া, কচুরিপানা ও প্রাকৃতিক ঘাস খাওয়াই। এর বাইরে কোনো রকম প্রযুক্তির আশ্রয় নেই না। আমার উদ্দেশ্য কেবল ব্যবসায়িক নয়। কেরানীগঞ্জবাসী যাতে ভালো মানের পশু কোরবানির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত নির্ভেজাল কোরবানির গোশত খেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ইঞ্জেকশন, ট্যাবলয়েট কিংবা বৈজ্ঞানিক আবিস্কৃত সব খাবারের মাধ্যমে পশু খুব তাড়াতাড়ি মোটা তাজা হলেও এতে পশুর জীবনের জন্যও যেমন ঝুঁকি তেমনি এ সকল পশুর মাংস খাওয়া আমাদের জীবনের জন্যও ঝুঁকির। খামারি অহাম্মেদ শফি বলেন, কোরবানির হাটে বিক্রি করার জন্য দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ৪০টি গরু নিয়ে খামার গড়ে তুলেছি। ২২ লাখ পাঁচশ টাকা দিয়ে ক্রয় করেছি এসব গরু। খামারে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে গরুগুলোকে লালন পালন করছি। গবাদি পশুর খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যয়ের পরিমাণও বেড়েছে। অবৈধপথে ভারতীয় গরু না আসলে কোরবানির হাটে গরুগুলো বিক্রি করে লাভবান হতে পারবো।

কলাতিয়া ইউনিয়নের দিপান্বিতা এগ্রো ফার্ম হাউজের মালিক আলী পরশ পলাশ বলেন, গরু মোটাতাজা করতে কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ খাবার ব্যবহার করি না। স্বাভাবিক যে খাবার সেটা ব্যবহার করি। খড়, ভুট্টার গুঁড়া, সয়াবিনের খৈল, ডাল, ভুসি, নারকেলের খৈল ইত্যাদি প্রধান খাদ্য হিসেবে গরুকে খাওয়ানো হয়। এ ছাড়া দেশি কাঁচা ঘাসও খাওয়ানো হয়।

তিনি বলেন, এবার আমাদের খামারে ৬০টি গরু আছে। ভারতীয় গরু না এলে কোরবানির ঈদবাজারে ভালো দাম পাব। রোহিতপুর ইউনিয়নের ধর্মপুর এলাকার ভাই ভাই এগ্রো ফার্মের মালিক ওহিদুর রহমান। বিদেশ ফেরত ওহিদুর এ বছর গড়ে তুলেছেন খামারটি। প্রাথমিক পর্যায়ে ২০ টি গরু নিয়ে তিনি খামার চালু করেছেন। ঈদকে টার্গেট করে প্রথম থেকে তিনি ২০টি গরুকে দেশীয় পদ্ধতিতে পালন করে আসছেন। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে আমি খামারটি গড়ে তুলেছি।

পোড়াহাটি ফিট অ্যান্ড ফ্রেস এগ্রো খামারের মালিক আকবর আলম উৎপল জানান, আমি প্রত্যেক ঈদে গরু বিক্রি করি। এবারও ৮/১০টি গরু বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেছি। ঘাস ও খড়ের পাশাপাশি খৈল, গুড়া, ভুষি খাওয়ানোর মাধ্যমে গরুগুলোকে বিক্রির জন্য তৈরি করেছি। কোনও ইনজেকশন বা ট্যাবলেট ব্যবহার করি না, এজন্য প্রতিবারই আমার গরু বিক্রি হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, গো খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় গরু মোটাতাজাকরণে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। খরচ বেশি হলেও লাভের আশায় বিনিয়োগ করেছি। ন্যায্য দাম পেলে লাভবান হবো। রোহিতপুর এলাকার কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, পুঁজি কম তাই বাড়িতে তিনটি গরু লালন পালন করছি। দাম কেমন পাবো জানি না। কোরবানির হাটে ভারতীয় গরু আসলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। ন্যায্য দাম না পেলে পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যাবে।

হযরপুরের আরেক প্রান্তিক খামারি আবুল হোসেন বলেন, খামার করার সামর্থ্য নাই। বাড়িতেই দুটি গরু পালন করছি। কোরবানির হাটে বিক্রি করবো। বাড়িতে বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু ব্যবসায়ীরা এসে গরুর দরদাম করছেন। আমার দুটি গরু ৬০ হাজার টাকায় কেনা আছে। ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করার আশা করছি।

কেরানীগঞ্জের একটি খামারে গরু কিনতে এসেছেন রাজধানীর হাজারীবাগের বাসিন্দা খোকন আহমেদ। তিনি বলেন, এখানের খামারের গরুগুলো দেশীয় পদ্ধতিতে পালন করে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়। যার কারণে মাংসে কোনো ক্ষতিকর উপাদান থাকে না। এছাড়া খামার থেকে সরাসরি কোরবানির গরু কেনাটা নিরাপদ। প্রতিবছর তিনি কেরানীগঞ্জের কোনো না কোনো খামার থেকে কোরবানির গরু কিনে থাকেন বলেন জানান।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুনসুর আহমেদ বলেন, বাজারে অসুস্থ বা কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা অসুস্থ পশুর দিকে আমাদের নজরদারি রয়েছে। তবে তিনি কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা ওষুধ সেবনে গরুর যে কোনো সময় প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে খামারিদের সতর্ক করেছেন। এবং ভারত থেকে গরু না আসলে এবছর কেরানীগঞ্জের খামারিসহ প্রান্তিক কৃষকরা বেশ লাভবান হবেন বলে আশা করে এ কর্মকর্তা।