• আজ সোমবার, ৩১ শ্রাবণ, ১৪২৯ ৷ ১৫ আগস্ট, ২০২২ ৷

শ্রীলঙ্কার জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান সামরিক বাহিনীর


❏ রবিবার, জুলাই ১০, ২০২২ আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক- শ্রীলঙ্কায় বিক্ষুব্ধ জনতা প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে হামলা ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আগুন দেওয়ার পর সামরিক বাহিনী জনগণকে শান্তি বজায় রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য আবেদন জানিয়েছে।

দেশটির সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা বিরুদ্ধে শনিবার হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা বাহিনীর স্টাফ প্রধান বলছেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শনিবার সারা দিন ধরে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার মধ্যে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে বুধবার পদত্যাগ করবেন এমন ঘোষণা করার পর সেনাবাহিনীর তরফ থেকে এই আবেদন জানানো হয়।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেও পদত্যাগ করতে রাজি হয়েছেন। ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হাতবদল নিয়ে আলোচনা করতে সে দেশের রাজনৈতিক নেতারা বৈঠক করতে যাচ্ছেন।

পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানালেও প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে এখন কোথায় আছেন তা পরিষ্কার নয়। কলম্বো থেকে বিবিসির একজন সংবাদদাতা শনিবার জানান, প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে এখন কোথায় আছেন তা নিয়ে কেউই কিছু জানেনা।

সংবাদদাতা বলেন, গুজব শোনা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট এখন কলম্বোর বিমানবন্দরে এবং তিনি যত দ্রুত সম্ভব দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন।

এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়েছে যে প্রেসিডেন্ট কলম্বো বন্দরের কাছে কোথাও আছেন এবং হয়তো সমুদ্রপথে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। এমন কথাও শোনা যাচ্ছে বন্দরের কাছে নোঙর করা দুটো জাহাজে প্রচুর লাগেজ ওঠাতে দেখা গেছে।

শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ এবং খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ আমদানি করতে সে দেশের সরকার হিমশিম খাচ্ছে। জরুরি ঋণের জন্য সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ)’র সঙ্গে আলোচনা করছে।

আইএমএফ বলেছে, তারা শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসানের আশা করছে যাতে করে সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের জন অর্থনৈতিক সাহায্যের প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা আবার শুরু হতে পারে।

কলম্বোয় প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে হামলা এবং প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের পর প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে ঘোষণা করেছেন যে বুধবার (১৩ই জুলাই) তিনি পদত্যাগ করবেন। হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি কেউই ওই সময় ভবনের ভেতরে ছিলেন না।

পার্লামেন্টের স্পিকার বলেছেন , প্রেসিডেন্ট “শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে” পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং জনসাধারণকে “আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের” আহ্বান জানিয়েছেন। এই ঘোষণার পর পর শহরে আতশবাজি পুড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করা হয়।

বিক্ষোভকারী, ফিওনা সিরমানা, যিনি রাষ্ট্রপতির বাড়িতে বিক্ষোভ করছিলেন, তিনি বলেছেন , “এবার প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীকে হটিয়ে শ্রীলঙ্কায় একটি নতুন যুগের সূচনার” সময় এসেছে।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, আমার খুব, খুব দুঃখ হচ্ছে যে তারা আগে পিছু হটেনি। তারা আগে সরে গেলে এতো ধ্বংসযজ্ঞ হতো না।

শনিবারের বিক্ষোভে বহু লোক আহত হয়েছেন এবং কলম্বোর প্রধান হাসপাতালের একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এএফপি-কে জানিয়েছেন যে তিনজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতিতে জর্জরিত এবং ৭০ বছরের ইতিহাসে দেশটি সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। যার কারণে খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধ আমদানি করতে লড়াই করতে হচ্ছে তাদের।

দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা শেষ হয়ে গেছে এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য পেট্রোল এবং ডিজেল বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হয়েছে, যার ফলে জ্বালানির জন্য দিনব্যাপী দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

শনিবারের অস্বাভাবিক ঘটনাটি মূলত শ্রীলঙ্কায় কয়েক মাস ধরে চলা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের চূড়ান্ত পরিণতি বলে মনে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের সরকারি বাসভবনের সামনে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে জাতীয় পতাকা নেড়ে স্লোগান দেয়। পরে তারা প্রেসিডেন্ট ভবনের ব্যারিকেড ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়ে।

অনলাইনে ফুটেজে দেখা গেছে যে অনেক মানুষ বাড়ির মধ্যে দিয়ে ঘোরাঘুরি করছে এবং প্রেসিডেন্ট পুলে সাঁতার কাটছে, অন্যরা ড্রয়ার খালি করেছে, রাষ্ট্রপতির জিনিসপত্র ঘাটাঘাটি করেছে এবং তার বিলাসবহুল বাথরুম ব্যবহার করেছে।

একদিকে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ বিলাসিতা এবং আরেকদিকে মাসের পর মাস দেশটির দুই কোটি ২০ লাখ মানুষের নিদারুণ কষ্ট সহ্য করার ‌ বিপরীতমুখী ছবি বিক্ষোভকারীদের উপর থেকে হারিয়ে যায়নি।

চানুকা জয়াসুরিয়া রয়টার্সকে বলেন, “পুরো দেশ যখন এমন চাপের মধ্যে রয়েছে, তখন মানুষ সেই চাপ থেকে মুক্তি পেতে এখানে এসেছে। আপনি যখন এই বাড়িতে এতো বিলাসিতা দেখেন তখন এটা স্পষ্ট যে তাদের দেশের জন্য কাজ করার সময় নেই।”

কলম্বো থেকে বিবিসি সংবাদদাতা আনবারাসান এথিরাজন জানাচ্ছেন, শ্রীলঙ্কার জন্য এটা অসাধারণ এক সময়। দিনব্যাপী ক্ষোভ ও সহিংসতার পর দেশটির দুই শীর্ষ নেতা পদত্যাগে রাজি হওয়ার পর খবরটি কলম্বোর প্রধান প্রতিবাদস্থলে পৌঁছালে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। শহরের অনেক জায়গায় পটকা ফোটানো হয়।

আমি গ্যালে ফেস নামের প্রতিবাদ স্থলে আছি – অনেক প্রতিবাদকারী বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন, হাজার হাজার মানুষ এখনও উপস্থিত রয়েছে। কেউ কেউ গান গেয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, উদযাপন করছে। বিবিসি

কতো মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা। কয়েকদিন আগে প্রেসিডেন্ট রাজাপাকশা এবং প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহের সংসদে হাসিমুখের একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হয়েছিল।

অনেকে এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে, বলেছেন যে দু’জনকে বেশ খুশি বলে মনে হয়েছে যেখানে কিনা দেশটির লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু এক সপ্তাহ রাজনীতিতে দীর্ঘ সময়।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, পরিকল্পিত বিক্ষোভের আগে নিরাপত্তা সতর্কতা হিসেবে রাজাপাকসে শুক্রবার তার সরকারি বাসভবন খালি করেছেন। যদিও এটি রাজাপাকসের সরকারি বাসভবন, তবে তিনি সাধারণত কাছেই আলাদা আরেকটি বাড়িতে ঘুমান।

বিবিসি প্রেসিডেন্টের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। কলম্বোর একটি অভিজাত পাড়ায় প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহের ব্যক্তিগত বাসভবনেও বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয়।

তিনি আগে বলেছিলেন যে তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সর্বদলীয় সরকারের জন্য পথ তৈরি করতে পদত্যাগ করতে ইচ্ছুক, কিন্তু তার এমন ঘোষণার পরপরই তার বাড়িতে আগুন দেয়ার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।

প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত বাড়িতে পরিবারসহ থাকতেন এবং তিনি তার সরকারি বাসভবন শুধুমাত্র দাপ্তরিক কাজের জন্য ব্যবহার করেন।

প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পিত পদত্যাগ বিক্ষোভকারীদের সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট হবে কিনা তা এখনও পরিষ্কার নয়।

কলম্বোর বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ভাবানি ফনসেকা বলেছেন, “শুধুমাত্র দুইজনের পদত্যাগ মানুষের দাবি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। মানুষের দাবি পুরো ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা। তবে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর চলে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে সেই দাবি পূরণের সূচনা হতে পারে।”

“এখানে ক্ষমতার একটি শান্তিপূর্ণ স্থানান্তর হতে হবে যা এখনও হয়নি,” তিনি সতর্ক করে বলেছেন।