সন্তানকে কোটি টাকার সম্পত্তি দিয়েও বৃদ্ধা মায়ের ঠাঁই হলো রাস্তায়

Cox's Bazar news
❏ রবিবার, জুলাই ৩১, ২০২২ চট্টগ্রাম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার: সন্তানকে নিজের প্রায় কোটি টাকার সম্পত্তি লিখে দেয়ার পরও বৃদ্ধা মায়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে নারাজ সন্তান। উল্টো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ছোট ছেলে ও ছেলের স্ত্রীর বিরুদ্ধে। জীবনের শেষ বয়সে শারীরিকভাবে অক্ষম অসহায় বৃদ্ধা মায়ের ঠাঁই এখন রাস্তায় কিংবা অন্যের দ্বারে দ্বারে।

কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়া কোনারপাড়া গ্রামের নুর আয়েশার বয়স প্রায় ৭০ বছর। বয়সের ভারে তেমন ভারি কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না এই বৃদ্ধা। একসময় নিজের ভবিষ্যতের চিন্তা না করে অনেক কষ্টে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই সন্তান বৃদ্ধা মায়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে নারাজ।

সেই মা এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভেবেছিলেন, জীবনের পড়ন্ত বেলায় ছেলের সংসারে সুখে-শান্তিতে থাকবেন তিনি। কিন্তু জমিজমা নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়ার দু-মাস পার না হতেই বাড়ি ছাড়া হতে হয় বৃদ্ধা মাকে। এ ঘটনায় ছেলের বিচার চেয়ে সবার দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ওই বৃদ্ধা মা।

ওই মায়ের নাম নুর আয়েশা (৭০)। তিনি একই গ্রামের মৃত আবুল খাইরের স্ত্রী। নিজে তেমন হাঁটাচলা করার সামর্থ নাই তাঁর। শারীরিকভাবেও অসুস্থ। এমন এক মাকে আগলে রাখার বদলে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছেলে সাবের ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে।

স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ কাজের প্রতিবাদ করায় ছোট দুই ভাই ও ভাগ্নেদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করছেন তিনি। ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পর বৃদ্ধা মা নুর আয়েশা স্থানীয়দের বাড়ি বাড়ি আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

নির্যাতনের সময় বৃদ্ধার চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে গেলে সাবের ও তার স্ত্রী তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে এবং বিষয়টি কাউকে জানালে মামলা করার হুমকি দেয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কোনারপাড়া গ্রামের আবুল খাইর গত ৯ বছর আগে মারা যান। তিনি মারা যাওয়ার পূর্বে তার স্ত্রী নুর আয়েশার নামে ২০ শতক জমি লিখে দিয়েছেন।

বৃদ্ধা নুর আয়েশা জানিয়েছেন, তার বিয়ের ১৪/১৫ বছর পর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে যায়। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো লালন-পালন করতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। পরে একটু সুখের আশায় ছেলে সাবেরকে ধার-দেনা ও জমিজমা বিক্রি করে বিদেশ পাঠান। এরপর থেকে সাবেরের স্বভাব চরিত্র পাল্টে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি তার ছেলে সাবেরের কাছে থাকতেন। মায়ের নামের ২০ শতাংশ জমি নিজের নামে লিখে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন সাবের। একপর্যায়ে মায়ের জমি তিনি নিজের নামে লিখে নেন। পরবর্তীতে গত ছয়মাস পূর্বে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে বসতবাড়িটিও নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য মাকে চাপ দিতে থাকেন। জমি লিখে নেওয়ার কিছুদিন পর মাকে ঘর থেকে বের করে দেন তিনি। এ নিয়ে সদর আ.লীগ নেতা মো: আলমের সভাপতিত্বে সালিসও হয়েছে।

স্থানীয় মসজিদ কমিটি ও ওয়ার্ড মেম্বারসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি জানার পর বেশ কয়েকবার সালিস বৈঠকও করেন। কিন্তু সাবেরের খামখেয়ালিপনায় কোনো সমাধান হয়নি। এখন নিরূপায় হয়ে বৃদ্ধা নুর আয়েশা এলাকার বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে রাত্রিযাপন করছেন। কখনো অনাহারে নয়তো অর্ধাহারে তাদের দিন কাটছে।

নুর আয়েশা জানান, তিনি তার স্বামীর দেওয়া ২০ শতক জমি পেয়েছিলেন। ওই জমিতে চাষাবাদ করতেন। আবাদি ফসল থেকে যা আয় হতো তাই দিয়ে তাদের সংসার চালাতেন। ছেলে ভালো থাকুক, থাকুক সুখে শান্তিতে। এমন ভাবনায় ছিল তার চোখে। কিন্তু ছেলের এমন অমানবিক কাণ্ডে নির্বাক নুর আশেয়া অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, অনেক কষ্টে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। শেষ বয়সে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকব। কিছু হলে ছেলে সুচিকিৎসা করাবে, সংসার চালাবে। তাই নিজের কথা না ভেবে ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবং তার কথায় ভুলে গিয়ে অন্য ছেলে মেয়েদের না জানিয়ে সব জমি-জমা ছেলের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি। দু-মাস না যেতেই ছেলের বউ ঠিক মতো খাবার দিত না। সকালের ভাত দুপুরে, তাও আবার পান্তা ভাত। কোনদিন ভাত দিলেও সঙ্গে তরকারি দিত না। আবার বেলা গড়িয়ে যদি দুপুরের ভাত খেতে দিত, সেদিন রাতে আর খাবার দিত না। ছেলেকে এসব কথা জানালে উল্টো আমার ওপর চড়াও হয়ে গালিগালাজ করত।

নুর আয়েশা বলেন, ‘ছেলে সাবের আমার নামের জমি লিখে নিয়ে আমাকে স্বামীর বসতঘর থেকে বের করে দিছে। আমি এর বিচার চাই। স্বামীর ভিটায় ফিরতে চাই।’ এ জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বৃদ্ধা নুর আয়েশা।

সাবেরের বোনেরা অভিযোগ করেন, ‘সাবের বিদেশ থাকাকালীন সময়ে মা-ছোট ভাইয়েরা মিলে ঘরটি তৈরী করে। সাবের দেশে ফিরে বাড়িটি তার দাবী করে মাকেসহ সবাইকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। কথায় কথায় পুলিশ দিয়ে হয়রানি করছে এবং সবসময় মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।’

ছোট ভাই আব্দুল্লাহর ভাষ্য, ‘জমি লিখে নিয়ে মাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার প্রতিবাদ করলে সাবের আমাকে, আমার ভাই ইউনুচ ও ভাগনেসহ ৪ জনের নাম উল্লেখ করে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি মিথ্যা মামলা করেন। মামলায় সাবের দাবি করেন, আমরা নাকি তাকে মারধর করেছি এবং তার জিনিসপত্র লুটপাট করেছি।’

এ বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজন দাবি, এলাকায় হামলা বা লুটপাটের কোনো ঘটনা ঘটেনি। একটু হাতাহাতি হয়েছে মা-ছেলের মধ্যে।

স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি মাষ্টার খুরশেদ আলম, আ.লীগ নেতা মো: আলম, শালিসকারক বাদশা মিয়া, শহিদুল্লাহ শকু, ছলিম উল্লাহ বলেন, ‘নুর আয়েশা স্থানীয়দের বাড়িতে বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ নিয়ে একাধিকবার সালিসও হয়েছে। কিন্তু ছেলে সাবের সালিসের সিদ্ধান্ত অমান্য করে মাকে ঘরে উঠতে দেননি। উল্টো মামলা করে মা ও ভাইবোনদের হয়রানি করছেন।’

তারা আরও বলেন, ‘সমাজ কমিটির পক্ষ থেকে সাবেরের সাথে যোগাযোগ করে তার মাকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলেও সে (সাবের) কারও কোন কথা শুনছেন না।’

জানতে চাইলে অভিযুক্ত সাবের বলেন, বিষয়টি তাদের পারিবারিক। এখানে কাউকে নাক গলাতে হবে না। এসময় স্থানীয় সাংবাদিকরা এ বিষয়টি নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছে এমন মন্তব্যও করেন তিনি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অমানবিক।’ তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য, বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত ও সন্তানদের বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস বাধ্যতামূলক করার বিধান করে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে আইন পাস করলেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। অথচ আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে বাবা মা’র ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে।