যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন মামলার মুখে পড়েছে বিশ্বের ৩ জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্লাটফর্ম ফেসবুক, গুগল ও টিকটক। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আসক্তি তৈরি এবং এর ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অভিযোগে আদালতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে জনপ্রিয় এই ৩ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে।
এএফপির প্রতিবেদন মতে, স্থানীয় সময় সোমবার (২৬ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা, অ্যালফাবেট ও বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) থেকে আদালত এই মামলার জুরি নির্বাচন শুরু করবে। এই মামলাকে মার্কিন বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসের একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষকরা।
এই মামলার রায় ৩ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরুদ্ধে গেলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এ ধরনের আরও হাজারো মামলার ঢেউ উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। আদালতে মেটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হতে পারে বলে জানা গেছে।
কম বয়সি শিশু, তরুণ ও তরুণীরা ওই তিন প্রতিষ্ঠানের সেবা ও পণ্য ব্যবহার করে অবসাদ, খাবারে অনাসক্তি, মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, এমনকি, আত্মহত্যাও করেছেন—এমন দাবি করেছেন বাদী পক্ষের হাজারো মানুষ। বাদী-পক্ষের আইনজীবীরা ১৯৯০ ও ২০০০ এর দশকে তামাক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা আইনি কৌশল বেছে নিচ্ছেন।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিশ্বখ্যাত সিগারেট উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ পণ্য বিক্রির অভিযোগ আনা হয়েছিল। বিচারক নিয়োগের পর আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে বিচারপতি ক্যারোলিন কুল-এর আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই মামলা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ১৯ বছর বয়সি এক মার্কিন নারী। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে শুধু নামের আদ্যাক্ষর ‘কে জি এম’ ব্যবহার করে তার পরিচয় দেয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির কারণে তিনি ‘মানসিক ক্ষতির’ শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ।
যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের মামলা ও আদালতের অভিযোগ গ্রহণের নজির নেই। সোশাল মিডিয়া ভিক্টিমস ল সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথু বার্গম্যান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এবারই প্রথম কোনো সমাজমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে শিশুদের ক্ষতি করার অভিযোগে বিচারকদের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে।’
বার্গম্যানের আইনজীবীরা এ ধরনের প্রায় এক হাজার মামলার দায়িত্বে আছেন। আইনজীবীদের এই প্রতিষ্ঠানটি অনলাইনে তরুণ-তরুণীদের ক্ষতি করার জন্য সমাজমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছে।
বার্গম্যান বলেন, ‘কে জি এম ও তার পরিবার যে একটি আদালতকক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে বড়, ক্ষমতাবান ও বিত্তবান প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখোমুখি দাঁড়াতে পেরেছেন, এটাই একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিজয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এটা বুঝতে পারছি যে এ ধরনের মামলাগুলো জেতা অনেক কঠিন এবং আগের, একই ধরনের ঘটনার নজির ও তথ্য-প্রমাণ টেনে বিজয়ী হওয়ার দায়ভার আমাদের ওপর বর্তেছে। আমাদেরকে প্রমাণ করতে হবে, এসব প্রতিষ্ঠান এমনভাবে তাদের প্ল্যাটফর্ম ডিজাইন করেছে যা কেজিএম-এর (মানসিক) ক্ষতি নিশ্চিত করে। এই দায়িত্ব আমরা খুশি মনেই কাঁধে নিয়েছি।’
এই বিচারের রায় ভবিষ্যতে একই ধরনের সব মামলার রায়কে সরাসরি প্রভাবিত করবে বলে মত দেন বার্গম্যান। গত সপ্তাহে অপর সমাজমাধ্যম স্ন্যাপচ্যাট আদালতের বাইরে চুক্তি করে এই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। ওই চুক্তির বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্লাটফর্মগুলোর দাবি, মার্কিন যোগাযোগ নৈতিকতা আইনের ২৩০ ধারা তাদেরকে সুরক্ষা দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কী পোস্ট করছেন, তা নিয়ে কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেহাই দেয় এই ধারা।
তবে মামলায় বিবাদীদের যুক্তি—সমাজমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এমনভাবে তাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, যা মানুষের মনোযোগ ধরে রাখে। পাশাপাশি সেখানে এমন সব কনটেন্টের প্রচারণা করা হয়, যা ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়।
বার্গম্যান আরও বলেন, ‘আমরা সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম থেকে ক্ষতিকারক কন্টেন্ট সরিয়ে নিতে না পারার জন্য মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করছি না।’ তার ভাষায়, ‘তাদের দোষ, তারা এমনভাবে প্ল্যাটফর্মগুলো বানিয়েছে যা শিশুদের আসক্ত করে তোলে। তাদের এলগরিদম এমন যে শিশুরা কনটেন্ট থেকে চোখ সরাতে পারে না।’
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নর্দার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ও অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের ফেডারেল আদালতেও একই ধরনের অভিযোগে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলার বিষয়ে উল্লেখিত তিন প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এইচএ