ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ভেতরের টানাপোড়েন ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। আসন ভাগাভাগি নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সমঝোতা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগে তৈরি হয়েছে জটিলতা, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে চট্টগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ও শরিক দলগুলোর ভূমিকার মধ্যে দ্বন্দ্ব ভোটের রাজনীতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
জামায়াতের দলীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটি আসন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। এসব আসন হলো—চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী), চট্টগ্রাম–৮ (চান্দগাঁও–বোয়ালখালী), চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) ও চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ)। সমঝোতা অনুযায়ী চট্টগ্রাম–১২ ও ১৪ আসন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), চট্টগ্রাম–৫ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং চট্টগ্রাম–৮ জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব আসনে জামায়াত নিজেদের প্রার্থী না দেওয়ার কিংবা শরিক দলের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চারটির মধ্যে দুটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় ব্যালটে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক থেকে গেছে। ফলে শরিক দলের প্রতীকের পাশাপাশি জামায়াতের প্রতীকও ভোটারদের সামনে হাজির হয়েছে। এতে ১১–দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক বার্তা দুর্বল হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম–৫ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. নাসির উদ্দীন এবং চট্টগ্রাম–১৪ আসনে এলডিপির প্রার্থী ওমর ফারুক নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছেন। এসব এলাকায় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জামায়াতের আলাদা কোনো দৃশ্যমান প্রচারণা দেখা যায়নি। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ঐক্যের প্রার্থী নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়নি।
তবে ভিন্ন চিত্র চট্টগ্রাম–৮ ও চট্টগ্রাম–১২ আসনে।
চট্টগ্রাম নগরের পাঁচটি ওয়ার্ড ও বোয়ালখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম–৮ আসনে ১১–দলীয় ঐক্যের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মো. জুবাইরুল হাসান আরিফ শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবু নাছেরের পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছে চান্দগাঁও, মোহরা, কধুরখীল, বোয়ালখালী পৌর সদর, চরখিদিঘিরপুর, পশ্চিম গোমদণ্ডী ও তুলাতল এলাকায়। এতে ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—১১–দলীয় ঐক্যের প্রকৃত প্রার্থী আসলে কে?
এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আলোচনা চললেও মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত সমন্বয় পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর মতে, জোটের পক্ষ থেকে যে ধরনের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা থাকার কথা, বাস্তবে তার ঘাটতি রয়েছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, চট্টগ্রাম–৮ ও চট্টগ্রাম–১২ আসনে জামায়াত ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থীদেরই সমর্থন দিচ্ছে। তাঁর দাবি, মূল প্রচারণা চালাচ্ছেন শরিক দলের প্রার্থীরাই।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের এক স্থানীয় নেতা বলেন, মাঠপর্যায়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন তৈরি হয়েছে। সে কারণে স্থানীয় কর্মীরা প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, যা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম–৮ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না রাখতে ২৩ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় আইনগতভাবে প্রতীক বাতিল বা প্রার্থী প্রত্যাহারের সুযোগ আর ছিল না।
পটিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম–১২ আসনে পরিস্থিতি আরও জটিল। শুরুতে এলডিপির এম এয়াকুব আলী জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। কিন্তু ঋণখেলাপির অভিযোগে তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। আপিল করেও তিনি প্রার্থিতা ফিরে পাননি এবং প্রতীক বরাদ্দ থেকেও বঞ্চিত হন। পরে উচ্চ আদালতে রিট করে প্রার্থিতা ফিরে পেলেও প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ সময় ইতোমধ্যে পার হয়ে যায়। এরপর ২৯ জানুয়ারি তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
এর আগে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদুল আলম ২৪ জানুয়ারি এলডিপিকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে এয়াকুব আলী সরে দাঁড়ানোর পর ফরিদুল আলম ৩০ জানুয়ারি থেকে ফের প্রচারণায় নামেন। এতে এলাকাজুড়ে নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের এই দুই আসনে দ্বৈত প্রতীক ও সমান্তরাল প্রচারণা ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে ভোট বিভাজনের পাশাপাশি জোটের রাজনৈতিক বার্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইখা