শুষ্ক মৌসুম এলেই সাতকানিয়ায় অবাধে কৃষি জমির মাটি কাটা শুরু হয়। রাতের অন্ধকারে যে যেভাবেই পারে স্কেভেটর (মাটি খননযন্ত্র) দিয়ে ফসলি জমির মাটি কেটে ডাম্পারযোগে (মিনি ট্রাক) ইটভাটায় বিক্রি করছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের রেললাইন ঘেঁষে উত্তর ঢেমশা ও তেমুহনী মৌজায় একাধিক চক্র গত কয়েক বছর ধরে শত শত হেক্টর ফসলি জমির মাটি কেটে নেয়ার ফলে এক সময়ের ফসলি জমি এখন বিশাল লেকে পরিণত হয়েছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে রেললাইনটি। এভাবে মাটি কাটা বন্ধ না হলে রেললাইন ধসে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মৌলভীর দোকান থেকে কেঁওচিয়া ইউনিয়নের আঁধার মানিক দরগাহ লাগোয়া এক সময়ের তিন ফসলি কৃষিজমির মাঠ এখন বিশালাকৃতির জলাশয়। কেঁওচিয়া ইউনিয়নের নয়াখাল, পাঠানিপুল ও আঁধার মানিক দরগার পশ্চিমে ঢেমশা এলাকায় মাটি খননের ফলে সৃষ্ট জলাশয় থেকে পুনরায় মাটি কাটার জন্য পাম্প বসিয়ে জলাশয় থেকে পানি তুলে দেওয়া হচ্ছে। এলাকার হাজারও গ্রাহকের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ না করে মিটারবিহীন পানির পাম্প বসিয়ে বিশাল জলাশয় সেঁচে মাটিখেকোদের পুনরায় মাটি কাটার উপযোগী করে দেওয়া হচ্ছে।
জানা যায়, সাতকানিয়ায় ৭৩ ইটভাটার ২৭টি বৈধ ও ৪৬টি অবৈধ। এসব ইটভাটায় বছরে অন্তত এক কোটি টন মাটি লাগে। এ জন্য বছরে ৬০০ হেক্টর জমি থেকে ৩০-৪০ ফুট গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়া হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে স্থানীয় দলীয় পদবি ও নামধারী অনেকেই কৃষিজমির টপ সয়েল কাটার কাজে জড়িত ছিল। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল অন্য দলের অনেক নেতা-কর্মী ও সমর্থক। সে সময় তারা নিজেদের আড়ালে রাখতেন। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের আমলে আড়ালে থাকারাই এখন সামনে চলে এসেছেন। আর ওই সময় যারা সামনে ছিলেন তারা আড়ালে চলে গেছেন।
সাতকানিয়ায় কৃষিজমির টপসয়েল কাটায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে এবং কেটে নেওয়া মাটি ৩০ দিনের মধ্যে ভরাটের জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশের ১০ মাস পার হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল মুনাফ সাতকানিয়ায় ইটভাটা মালিকদের জোরপূর্বক মাটি কাটা বন্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে (১৯ মার্চ) হাইকোর্ট রুল দিয়ে ইটভাটার মাটিকাটার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেন।
আদেশের পরও সংশ্লিষ্ট কৃষিজমির টপসয়েল কাটা অব্যাহত থাকার বিষয়টি একই বছরের (২২ এপ্রিল) বিচারপতি মোস্তাফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর আদালতের নজরে আনেন রিট আবেদনকারীর আইনজীবী। শুনানি নিয়ে আদালত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সাতকানিয়া থানার ওসিকে (২৩ এপ্রিল) দুপুরে ভার্চুয়ালি আদালতে যুক্ত হতে তলব করেন।
একই বছরের (২৩ এপ্রিল) চার কর্মকর্তা ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। পরে দায়ীদের খুঁজে বের করতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজকে এক মাসের মধ্যে তদন্ত করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। এ ছাড়া কৃষিজমির উপরিভাগের কাটা মাটি (টপসয়েল) ৩০ দিনের মধ্যে বাইরে থেকে পলিমাটি এনে ভরাট ও ঢাকা-কক্সবাজার রেললাইন থেকে কত দূরে সাতকানিয়ায় মাটি কাটা হচ্ছে এবং এতে করে রেললাইন হুমকির মুখে পড়ে কি না, তাও অনুসন্ধান করে রিপোর্টে উল্লেখ করতে হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়।
আদালতের নির্দেশের দীর্ঘ ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত মাটিখেকো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভরাট করা হয়নি খনন করা কৃষিজমিগুলোও। বরং নতুন করে কিছু এলাকায় মাটি কাটা হচ্ছে।
সাতকানিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন বিশ্বাস বলেন, ‘মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। গত ৩ মাসে বেশ কয়েকটি খননযন্ত্র জব্দ এবং অনেকজনের কাছ থেকে জরিমানা আদায় ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন দেখে থাকে। মাটি কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রাম (পূর্ব) এর বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামান বলেন, রেললাইনের কতদূর থেকে মাটি কাটা হচ্ছে তা পরিদর্শন করে দেখে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসআর