চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের গোড়া উপড়ে ফেলতে চান তিনি। তবে এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যারা এসব অপকর্মে জড়িত, তারাও যদি সৎপথে ফিরে আসেন, তাহলে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চৌদ্দগ্রাম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ এখন বড় ধরনের পরিবর্তন চায়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির পর যে পরিবর্তন আসবে, তা আসবে যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা, মায়েদের নিরাপত্তা ও দেশের মর্যাদার ভিত্তিতে। তিনি বলেন, আগামীর বাংলাদেশে আর কোনো আধিপত্যবাদ, ফ্যাসিবাদ বা দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা মেনে নেওয়া হবে না। দেশবাসী একটি মানবিক বাংলাদেশ চায়, আর সেই লক্ষ্যেই এগারো দলীয় জোট এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে যারা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, আগামীর বাংলাদেশ তাদের পক্ষেই থাকবে। জামায়াতে ইসলামী কোনো দলীয় শাসন কায়েম করতে চায় না। তারা শুধু একটি দলের নয়, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় নিশ্চিত করতে চায়। এই বিজয় হবে এগারো দলীয় জোটের সম্মিলিত বিজয়। যেখানে যে প্রতীক থাকবে, সেই প্রতীকের পক্ষেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, অতীতের খাতা এক পাশে রেখে বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করলেই মানুষের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। যারা মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানে আঘাত করেছে এবং মা-বোনদের ইজ্জতের ওপর হাত দিয়েছে, তাদের হাতে কি দেশের নারীরা নিরাপদ থাকতে পারে—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, মা ও বোনেরা এখন এগারো দলীয় জোটকে আস্থার জায়গা হিসেবে দেখছেন বলেই একটি মহল অস্থির হয়ে উঠেছে। কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে, প্রয়োজনে জুলাইয়ের মতো আবারও যুবসমাজ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা এমন একটি সমাজ গড়তে চান, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পূর্ণ নিরাপত্তা থাকবে এবং সবাই হালাল উপার্জনের মাধ্যমে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবেন। দুর্নীতিতে জড়িতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একসময় যারা নিপীড়িত ছিলেন, তারা কেন নিপীড়ক হয়ে উঠলেন—এ প্রশ্ন নিজেদের কাছে করা উচিত। এসব অপকর্ম ছেড়ে দিলে তাদেরও গ্রহণ করা হবে, আর যারা সংশোধিত হবে না, তাদের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান বেতনে অনেকের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে একটি জনকল্যাণমূলক সরকার গঠন করা হবে এবং মানুষের কল্যাণে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কওমি মাদ্রাসা প্রসঙ্গে প্রচলিত গুজব নাকচ করে তিনি বলেন, কওমি অঙ্গনের অন্যতম নেতা মামুনুল হক তাদের সঙ্গে রয়েছেন। কওমি মাদ্রাসা বন্ধ করার প্রশ্নই আসে না; বরং এর উৎকর্ষ সাধনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
যুবসমাজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, যুবকেরা বেকার ভাতার জন্য নয়, নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনে নেমেছিল। জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু বেকার ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুবসমাজকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। এখন প্রয়োজন সম্মানজনক কর্মসংস্থান। আগামীর বাংলাদেশ হবে তারুণ্যনির্ভর ও উদ্যমী বাংলাদেশ।
ক্ষমতায় গেলে সহযোগিতার জন্য কিছু শর্তের কথাও উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি বা জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করা যাবে না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা বিচারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হবে। এসব শর্ত মানলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এ দেশে সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে এবং কেউ কারও ধর্ম পালনে বাধা দিতে পারবে না। পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। এ ছাড়া বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম ও মাওলানা আবদুল হালিম, ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েম এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহজাহানসহ অন্যান্য নেতারা।
ইখা