ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর) আসনে ভোটের উত্তাপ চোখে পড়ার মতো। আসনটি মূলত কৃষিপ্রধান এবং গ্রামবাংলার সংযোগ সড়কের দুর্বলতার কারণে বহুদিন ধরে উন্নয়নের আলো থেকে দূরে। তাই প্রতিটি প্রার্থী এবার ভোটারদের মন জয় করতে নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উপজেলার গ্রাম, হাটবাজার এবং সড়কের মোড়গুলোতে চলছে পথসভা, উঠান বৈঠক এবং লিফলেট বিতরণ। ব্যানারে ছেয়ে গেছে জনপদ। ভোটারদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর জন্য প্রার্থীরা প্রতিদিন ঘুরছেন ঘুরছেন, কথা বলছেন, শুনছেন এলাকার মানুষদের সমস্যার গল্প।
এই আসনের প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করছেন। কেউ বলছেন সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার প্রতিশ্রুতি, কেউ চাকরি ও নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টির আশ্বাস দিচ্ছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আধুনিক করার কথা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও সব প্রার্থীর বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া গ্রামের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় কৃষকদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রার্থীরা বলছেন, সেচ সুবিধা বাড়ানো, সার ও উন্নত বীজ সহজলভ্য করা এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে। কৃষক যদি ভালো থাকেন, পুরো এলাকার উন্নয়ন হবে এভাবেই তারা ভোটারদের কাছে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরছেন।
এখন পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় দেখা গেছে বিএনপির প্রার্থী আখতারুজ্জামান মিয়া এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আফতাব উদ্দিন মোল্লাকে। তারা খানসামা ও চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে নিয়মিত পথসভা ও গণসংযোগ করছেন। সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন, তাদের সমস্যা শুনছেন এবং সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন।
অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আনোয়ার হোসাইন এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী নুরুল আমিন শাহ এখনো তেমনভাবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় নেই। তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে কম। এই বিষয়টিও ভোটারদের নজরে এসেছে এবং তাদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনী মাঠে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া বেশ মিশ্রিত। অনেকেই বলছেন, তারা এবার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজ দেখতে চান। আগের নির্বাচনে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সবগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এবারের ভোটে প্রার্থীর সততা, কাজের বাস্তবতা এবং মানুষের পাশে থাকার মানসিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তরুণ ভোটারদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। তারা চাকরি, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক শিক্ষার সুযোগ চান। নারী ভোটাররা নিরাপদ সড়ক, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুর–৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লক্ষ সতেরো হাজার সাতশ সাতষট্টি জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লক্ষ আট হাজার ছয়শ আটাত্তর জন, নারী ভোটার দুই লক্ষ নয় হাজার সাতাশি জন এবং হিজড়া ভোটার দুই জন। ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে মোট একশ ছাব্বিশটি ভোটকেন্দ্র।
নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে প্রশাসনও তৎপর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল দিচ্ছে, নির্বাচনী আচরণবিধি মানতে প্রার্থীদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করার সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর) আসনে নির্বাচনী মাঠ এখন সরগরম। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আর প্রত্যাশার দোলাচলে ভোটাররা ভাবছেন, শেষ পর্যন্ত কারা মাঠে সক্রিয় থাকবেন এবং কারা ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন। সেটিই এই আসনের ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করবে।
এসআর