এইমাত্র
  • ৫০ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির আটক
  • এককভাবে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী তারেক রহমান
  • অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কমিশন: সিইসি
  • কক্সবাজারে ৫৯৮ কেন্দ্রের মধ্যে ৩২৯ ঝুঁকিপূর্ণ, ভোটের আগে উদ্বেগ বাড়ছে
  • আজ থেকে টানা ৪ দিনের সরকারি ছুটি শুরু
  • রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে এসেছে প্রায় ৯ লাখ পোস্টাল ব্যালট
  • বিএনপি-জামায়াতের সরাসরি লড়াই, ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যালঘু ভোট
  • ভোটকেন্দ্রে বাদাম-বিস্কুট-কলা খাওয়াসহ যেসব কাজ করতে পারবে না পুলিশ
  • নির্বাচনী হাওয়ায় বদলে গেছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
  • ইতিবাচক সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রশ্নে আমরা 'হ্যা' এর পক্ষে: আহমাদুল্লাহ
  • আজ বুধবার, ২৮ মাঘ, ১৪৩২ | ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
    দেশজুড়ে

    প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভিড়ে এক স্বপ্নবাজের লড়াই

    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

    প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভিড়ে এক স্বপ্নবাজের লড়াই

    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম



    রামু উপজেলার খুনিয়াপালংয়ের কালুয়ারঘোনার অজোপাড়া গ্রামের সরু মেঠোপথ ধরে হাঁটলে চেনা এক দৃশ্য চোখে পড়ে। কাঁচা মাটির টিনের চালার ঘর, উঠোনে কাঠ শুকোচ্ছে, দূরে শীতল হাওয়ায় দুলছে পাহাড়ী টিলায় নানা ধরনের গাছ। এই বাস্তবতার ভেতরেই বড় হয়েছেন মোঃ ইলিয়াছ মিয়া। 


    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আজ তিনি কক্সবাজার-৩ আসনে ফুটবল মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী। তার শ্লোগান, ‘রাজনীতি একটি ওয়াদা Politics is a Commitment।’ কথাটি তিনি শুধু নির্বাচনী পোস্টারে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং দাবি করেন, গত ১৪ বছরের মাঠের কাজেই তার প্রমাণ রয়েছে।


    কক্সবাজারকে তিনি শুধু পর্যটন শহর হিসেবে দেখেন না। তার ভাষায়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারির অঞ্চল, উপকূলীয় নিরাপত্তার বলয় এবং কৃষক, জেলে, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ভূখণ্ড। এই অভিজ্ঞতাই তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি।


    স্থানীয়দের অনেকে বলেন, ইলিয়াছ মিয়াকে দীর্ঘদিন ধরেই মাঠে দেখা যায়। পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, অভিবাসী ও শরণার্থী অধিকার এসব বিষয়ে কর্মসূচি করেছেন তিনি। 


    বর্তমানে তিনি ‘সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিইএইচআরডিএফ)’- এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দাবি, দেশি-বিদেশি প্রায় দুই শতাধিক সংগঠন ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার কাজের সম্পর্ক রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা সংসদে কাজে লাগাতে চান তিনি। 


    তার বক্তব্য, ‘ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব- এটাই আমার রাজনীতি।’ বড় দলের প্রার্থী নন, পেছনে বিশাল সাংগঠনিক কাঠামো নেই। তবু তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের আস্থা পেলে সমীকরণ বদলানো যায়। সাত দফায় পরিবর্তনের রূপরেখা ইলিয়াছ মিয়ার ইশতেহারে সাতটি অগ্রাধিকার খাত তুলে ধরা হয়েছে।


    প্রথমত, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। স্থানীয় প্রশাসনে দালালমুক্ত সেবা, সরকারি দপ্তরে ঘুষ বন্ধে সামাজিক নজরদারি এবং জনগণের অভিযোগ গ্রহণে ডিজিটাল হেল্পডেস্ক চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। নির্বাচিত হলে ‘এমপি ক্লিনিক’ চালুর মাধ্যমে সরাসরি অভিযোগ শোনার পরিকল্পনার কথাও বলেছেন।


    দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি। পর্যটন, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলেছেন। যুবকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ ও স্টার্টআপ তহবিল, নারীদের জন্য ঘরে বসে আয়ের সুযোগ এবং প্রবাসী কর্মীদের আইনি সহায়তা কেন্দ্র গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।


    তৃতীয়ত, শিক্ষা। প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল লার্নিং সেন্টার, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, ঝরে পড়া রোধে ‘স্কুল রিটার্ন’ কর্মসূচি এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারের পরিকল্পনা করেছেন। তার ভাষায়, ‘শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার।’


    চতুর্থত, স্বাস্থ্যসেবা। ইউনিয়ন পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ কর্মসূচির কথা বলেছেন। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা সহায়তার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।


    পঞ্চমত, কৃষক, জেলে ও শ্রমিক কল্যাণ। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, জেলেদের জীবনবীমা ও আধুনিক সরঞ্জাম এবং শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড চালুর অঙ্গীকার করেছেন তিনি।


    ষষ্ঠত, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও পরিবেশ সুরক্ষা। উপকূল রক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এবং বন-পাহাড় রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেছেন। প্লাস্টিক দূষণ রোধে একটি স্থানীয় মডেল কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তার।


    সপ্তমত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন। তরুণদের নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ, নারীর নিরাপত্তা, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।


    ইলিয়াছ মিয়া প্রকাশ্যে শপথ নিয়েছেন, রাজনীতি করবেন মানুষের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়। বৈষম্য, দুর্নীতি, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। 


    তার বক্তব্যে দায়িত্ববোধের বিষয়টি বারবার ফিরে আসে। নির্বাচনী এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘এই দায় আমি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝেও রেখে যেতে চাই।’


    জানা গেছে, কক্সবাজার-৩ আসন উপকূলীয় ও সীমান্তঘেঁষা এলাকা। জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখানে বড় চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটও স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলেছে। এই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে বড় দলগুলোর প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইলিয়াছ মিয়া।


    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী লড়াই সহজ নয়। সংগঠন, অর্থবল এবং দীর্ঘদিনের ভোটব্যাংক- সব মিলিয়ে শক্ত সমীকরণ তৈরি হয়। ইলিয়াছ মিয়া নিজেও তা অস্বীকার করেন না। 


    তার মতে, পথ কঠিন। কিন্তু মানুষ যদি চায়, সমীকরণ বদলাতে সময় লাগে না।


    কক্সবাজার অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে একজন তরুণ নেতৃত্ব সংসদে গেলে নতুন কণ্ঠস্বর তৈরি হতে পারে- এমন আশা তার সমর্থকদের।


    নুরুল হক বুলবুল নামের স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, ‘ওকে বহু বছর ধরে মাঠে দেখছি। পরিবেশ আর মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। এখন প্রশ্ন, ভোটে মানুষ কতটা সাড়া দেয়।’


    ইলিয়াছ মিয়া তার প্রচারণায় দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা মানুষদের দিকে হাত বাড়িয়েছেন। কৃষক, শ্রমিক, জেলে, প্রবাসী, তরুণ, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী- এই অংশকে তিনি নিজের শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ভোটকে তিনি দেখেন মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে।


    তার ঘনিষ্ঠদের মতে, তার প্রার্থিতা কেবল নির্বাচনী অংশগ্রহণ নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা। তারা বলেন, ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তির একজন মানুষ সংসদে গেলে সেটাই হবে পরিবর্তনের শুরু।’


    অজোপাড়া গ্রামের উঠোন থেকে শুরু হওয়া এক তরুণের পথচলা আজ জাতীয় রাজনীতির দরজায়। সামনে কঠিন প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা, নানা প্রশ্ন। তবু তার আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট।


    কক্সবাজারের নোনা বাতাসে দাঁড়িয়ে ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পুরোনো প্রথা পায়ে মাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করায় আমার কাছে ওয়াদা। সেই ওয়াদা আমি রাখতে চাই।’


    এখন সিদ্ধান্ত ভোটারদের। শক্ত সমীকরণের ভেতর এই স্বপ্নবাজ তরুণের লড়াই কত দূর যাবে, তার উত্তর মিলবে আগামীর ব্যালটের বাক্সেই।


    এসআর

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    চলতি সপ্তাহে সর্বাধিক পঠিত

    Loading…