এই সপ্তাহের শুরুতে ঘূর্ণিঝড় গেজানি মাদাগাস্কারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরে আঘাত হানে। এতে প্রায় ৪০ জন নিহত এবং ১২ হাজারের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। এদিকে ঝড়টি এবার মোজাম্বিকে আঘাত হানার আশঙ্কায় দেশটি প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হালনাগাদ করে বৃহস্পতিবার মাদাগাস্কারের জাতীয় ঝুঁকি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তর (বিএনজিআরসি) জানায়, এখন পর্যন্ত ৩৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আরো ছয়জন নিখোঁজ এবং অন্তত ৩৭৪ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার ভারত মহাসাগরের দ্বীপদেশ মাদাগাস্কারের পূর্ব উপকূলীয় শহর তোয়ামাসিনায় গেজানি আঘাত হানে। তখন বাতাসের গতি ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার (১৫৫ মাইল) পর্যন্ত পৌঁছায়। দেশটির নতুন নেতা কর্নেল মাইকেল র্যান্ড্রিয়ানিরিনা জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি তোয়ামাসিনা ও আশপাশের এলাকার প্রায় ৭৫ শতাংশ ধ্বংস করে দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের শহরটিতে ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছ ছড়িয়ে আছে এবং অনেক বাড়ির ছাদ উড়ে গেছে। বাসিন্দারা ভাঙা কাঠ, টিন ও ধ্বংসস্তূপের স্তূপ সরিয়ে অস্থায়ী ঘরবাড়ি মেরামতের চেষ্টা করছেন।
বিএনজিআরসি জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ে ১৮ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং অন্তত ৫০ হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা প্লাবিত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, অনেক মৃত্যু ঘটেছে ভবন ধসে পড়ায়, কারণ অনেক বাড়িই শক্তিশালী ঝড় মোকাবেলার উপযোগী নয়। তোয়ামাসিনাকে রাজধানী আন্তানানারিভোর সঙ্গে যুক্ত প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, ফলে ত্রাণবাহী যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। টেলিযোগাযোগব্যবস্থাও অস্থির হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তোয়ামাসিনার আশপাশের আতসিনানানা অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখনো ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন চলছে।
ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার (৬০০ মাইল) দূরে অবস্থিত তাদের রিইউনিয়ন দ্বীপ থেকে খাদ্য সহায়তা ও উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তারা পরিস্থিতিকে ব্যাপক ধ্বংস ও বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটি জানায়, উপগ্রহ যুগে এই অঞ্চলে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড়গুলোর একটি হতে পারে গেজানি। ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় জেরাল্ডার সঙ্গে এর তুলনা করা হচ্ছে। ওই ঝড়ে অন্তত ২০০ জন নিহত হয় এবং পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
স্থলভাগে আঘাত হানার পর গেজানির শক্তি কিছুটা কমে গেলেও বুধবার রাত পর্যন্ত এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় হিসেবে দ্বীপজুড়ে প্রভাব ফেলেছে। লা রিইউনিয়নের আঞ্চলিক বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র জানিয়েছে, মোজাম্বিক চ্যানেলে পৌঁছালে এটি আবার ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে এবং শুক্রবার সন্ধ্যার পর দক্ষিণ মোজাম্বিকে আঘাত হানতে পারে।
বৃহস্পতিবার মোজাম্বিক কর্তৃপক্ষ ঝড় নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। তারা জানিয়েছে, ঘণ্টায় প্রবল বাতাস ও ১০ মিটার উঁচু ঢেউসহ উত্তাল সাগরের সৃষ্টি হতে পারে। সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বসবাসকারীদের সরে যেতে বলা হয়েছে। মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিক— দুই দেশই ভারত মহাসাগর থেকে আসা শক্তিশালী ঝড়ের ঝুঁকিতে থাকে। গত মাসেই মাদাগাস্কারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ফিটিয়া নামের আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, এতে অন্তত ১৪ জন নিহত হয়।
এদিকে মৌসুমি ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে মোজাম্বিকে ইতিমধ্যেই ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সূত্র : আলজাজিরা
এবি