এইমাত্র
  • ইরানে হামলার প্রস্তুতি শেষ, ট্রাম্পের নির্দেশের অপেক্ষায় সামরিক বাহিনী
  • তিন বছরে পাঁচ লাখ শ্রমিক নেবে ইতালি, শেষ প্রথম ধাপ
  • ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ভাই অ্যান্ড্রু গ্রেপ্তার
  • নির্বাচনের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করল ইসি
  • শৈলকুপায় জমি নিয়ে বিরোধে মারধরে কৃষকের মৃত্যু, আটক ২
  • রায়পুরে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের মতবিনিময়
  • পাবিপ্রবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি তুষার মাহমুদ, সেক্রেটারি আবু সামা
  • বাঘাইছড়িতে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ
  • একুশে পদক পাচ্ছেন ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যান্ড ওয়ারফেজ
  • এবারও রমজানজুড়ে প্রতিলিটার দুধ ১০ টাকা করে বিক্রি করলেন জেসি এগ্রো ফার্ম
  • আজ বৃহস্পতিবার, ৬ ফাল্গুন, ১৪৩২ | ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
    দেশজুড়ে

    অম এড়াতে ইফতারে চাই লঘু ও সহজপাচ্য আহার

    মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা, মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
    মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা, মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

    অম এড়াতে ইফতারে চাই লঘু ও সহজপাচ্য আহার

    মো. ইব্রাহীম খলিল মোল্লা, মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম


    আজ পবিত্র রমজান মাসের প্রথম রোজা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সংযমের যে সাধনা, তা কেবল ধর্মীয় বিধান নয়; এটি শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক শুদ্ধির এক গভীর প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সারাদিনের উপবাস শেষে আমরা অনেকেই এমন খাবার দিয়ে ইফতার শুরু করি, যা শরীরের ওপর আকস্মিক ও অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে।


    বেগুনি, পিয়াজু, আলুর চপ, পুরি, জিলাপি ইত্যাদি জাতীয় এসব ছাড়া যেন ইফতার কল্পনাই করা যায় না। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, আমাদের বাবা-মা এভাবেই ইফতার করতেন। পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক রীতি আর স্বাদের টানে ভাজাপোড়াই হয়ে উঠেছে ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক হিসেবে বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই অভ্যাস আমাদের অজান্তেই শরীরের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বীজ বপন করছে।


    দীর্ঘ সময় উপবাসের পর শরীরের বিপাকক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়। ইনসুলিনের কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়ে। পাকস্থলীতে অ্যাসিড জমে থাকলেও খাদ্য না থাকায় তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। এ সময় যদি হঠাৎ অতিরিক্ত তেল, চর্বি ও মশলাযুক্ত খাবার পাকস্থলীতে প্রবেশ করে, তখন পাচনতন্ত্র প্রস্তুত না থাকায় তা সঠিকভাবে হজম করতে পারে না। ফলে অম্লতা, বুকজ্বালা, গ্যাস্ট্রিক, পেটফাঁপা, ডায়রিয়া কিংবা বমিভাব দেখা দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে রোজার মাসে হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যায়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে। আমরা ভাবি, ‘সারাদিন না খেয়ে ছিলাম, এখন একটু ভালো করে খাই।’ কিন্তু শরীরের জৈবিক বাস্তবতা আমাদের আবেগ বোঝে না; সে কেবল তার সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করে।


    আয়ুর্বেদের ভাষায়, উপবাস শরীরের ‘অগ্নি’ বা পাচনশক্তিকে বিশ্রাম দেয় এবং জমে থাকা অপচয়জাত বিষাক্ত পদার্থ যাকে বলা হয় ‘অম’ তা হ্রাস করার সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু উপবাসের পর যদি ভারী, তেলযুক্ত ও কঠিনপাচ্য খাবার গ্রহণ করা হয়, তখন সেই মন্দাগ্নি তা পরিপূর্ণভাবে পরিপাক করতে পারে না। অপূর্ণ পরিপাক থেকেই শরীরে অম সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে নানা রোগের ভিত্তি তৈরি করে। জয়েন্টের ব্যথা, চর্মরোগ, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, এমনকি হৃদরোগসহ এসব জটিলতার পেছনেও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। আয়ুর্বেদের মূলনীতি স্পষ্ট, লঘু, উষ্ণ, সহজপাচ্য ও প্রাকৃতিক আহারই স্বাস্থ্যরক্ষার ভিত্তি।


    মনে রাখতে হবে-ইফতার কখনোই হঠাৎ ভারী ও তেলচর্বিযুক্ত খাবার দিয়ে শুরু করা উচিত নয়। সারাদিন উপবাসের পর পাকস্থলী ও পাচনতন্ত্র অনেকটা বিশ্রামের অবস্থায় থাকে। এ সময় হঠাৎ ভাজাপোড়া খাবার প্রবেশ করলে তা হজমে সমস্যা তৈরি করে এবং অম্লতা, বুকজ্বালা কিংবা পেটফাঁপার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তাই ইফতার শুরু হওয়া উচিত ধীর, সচেতন ও শরীরবান্ধব উপায়ে।


    প্রথমে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি পান করা ভালো। এতে পাকস্থলী ধীরে ধীরে সক্রিয় হয় এবং দীর্ঘ সময়ের উপবাসের পর শরীর পানিশূন্যতা কাটিয়ে উঠতে শুরু করে। চাইলে পানিতে অল্প লেবু মিশিয়ে নেওয়া যেতে পারে, যা হজমশক্তি উদ্দীপিত করতে সহায়তা করে। এরপর এক বা দুটি খেজুর খাওয়া যেতে পারে। খেজুরে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা দ্রুত শরীরে শক্তি জোগায় এবং দুর্বলতা কমায়। তবে পরিমিত খাওয়াই উত্তম, বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে।


    এ ছাড়া মৌসুমি ফল ইফতারের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পেঁপে হজমে সহায়তা করে, আপেল ও পেয়ারা ফাইবার সরবরাহ করে অন্ত্রের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখে, আর তরমুজ শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে। ফলমূল দিয়ে ইফতার শুরু করলে শরীর ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পায়, কিন্তু হঠাৎ কোনো চাপ পড়ে না। কেউ কেউ ভেজানো চিয়া বা তোকমা দানা পানিতে মিশিয়ে খান, যা শরীরে পানির ভারসাম্য রক্ষা ও দীর্ঘস্থায়ী শক্তি দিতে সাহায্য করে। এরপর অল্প পরিমাণে সেদ্ধ ছোলা, শসা-টমেটোর হালকা সালাদ কিংবা পাতলা সবজি স্যুপ খাওয়া যেতে পারে। এসব সহজপাচ্য খাবার পাচনতন্ত্রকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনে এবং শরীরকে অতিরিক্ত তেলের ধাক্কা থেকে রক্ষা করে।


    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইফতার যেন হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের উপলক্ষ না হয়। বরং ধাপে ধাপে, হালকা ও প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে শক্তি যেমন পাওয়া যায়, তেমনি গ্যাস্ট্রিক, অম্লতা ও বদহজমের ঝুঁকিও কম থাকে।


    আমাদের মনে রাখতে হবে, ইফতার কোনো প্রতিযোগিতা নয়; এটি উপবাস ভাঙার এক বিনয়ী প্রক্রিয়া। রমজান আমাদের সংযম শেখায়। সেই সংযম খাদ্যাভ্যাসেও প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। আমরা যদি প্রতিদিনের ইফতার থেকে অন্তত অর্ধেক ভাজাপোড়া কমাতে পারি, সেটিই হবে বড় পদক্ষেপ। পরিবারে শিশুদের সামনে যদি স্বাস্থ্যসম্মত ইফতারের উদাহরণ স্থাপন করি, তবে আগামী প্রজন্ম ভিন্ন অভ্যাসে অভ্যস্ত হবে। আজ যে শিশুটি দেখে শিখছে, আগামীকাল সে-ই সমাজের খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে তুলবে।


    চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয়, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর।’ আয়ুর্বেদও হাজার বছর আগে থেকেই একই শিক্ষা দিয়ে আসছে, রোগ হওয়ার আগেই খাদ্য ও জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রমজান সেই আত্মশুদ্ধির এক মহাসুযোগ। সারাদিনের ইবাদতের পর যদি আমরা এমন খাদ্য গ্রহণ করি, যা শরীরকে ভারাক্রান্ত করে তোলে, তবে সেই সংযমের সুফল অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।


    আমি একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক হিসেবে প্রতিদিন দেখি, সামান্য খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন কত বড় স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন আনতে পারে। আবার একজন সাংবাদিক হিসেবে সমাজের প্রবণতাও লক্ষ্য করি। আমরা সচেতনতার কথা বলি, কিন্তু প্লেটে পরিবর্তন আনতে দ্বিধা করি। অথচ পরিবর্তন শুরু হতে পারে আজ সন্ধ্যা থেকেই। ইফতারের টেবিলে যদি ভাজাপোড়ার বদলে ফল, সালাদ, স্যুপ ও প্রাকৃতিক খাবারের আধিক্য বাড়ে, তবে সেটিই হবে রমজানের প্রকৃত চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।


    রমজান আত্মসংযমের মাস। আসুন, সেই সংযমকে কেবল ক্ষুধা-পিপাসায় সীমাবদ্ধ না রেখে খাদ্যসংস্কৃতিতেও প্রয়োগ করি। সাময়িক স্বাদের তৃপ্তির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্য অনেক বেশি মূল্যবান। ইফতার হোক শরীরের ওপর বাড়তি চাপ নয়, বরং পুনরুজ্জীবনের সূচনা। তাহলেই রমজানের শিক্ষা আমাদের জীবনে পূর্ণতা পাবে।


    এসআর

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    সর্বশেষ প্রকাশিত

    Loading…