দেশে অসংখ্য ‘ক্লুলেস’ হত্যা মামলা শনাক্ত হয়েছে। বিচার পেয়েছেন স্বজনরা। কিন্তু আড়ালেই রয়ে গেল সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনীর খুনিরা। ১৪ বছর আগের নৃশংস এই হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্সও খুনিদের শনাক্ত করতে পারেনি। তারা এক বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত করেও কোনো কূলকিনারা পাননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে এ মামলার ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছেন তারা। উল্লেখ্য, চূড়ান্ত প্রতিবেদন হলো ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক কোনো মামলার তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদন, যাতে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা না পেলে বা পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের পর আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এজন্য তদন্তে খুনিরা চিহ্নিত হচ্ছে না। মামলার বাদী নিহত রুনীর ভাই নওশের আলম রোমান বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে বলেন, বিচারের আশা আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর নতুন করে আশার আলো দেখছিলাম। ভেবেছিলাম এবার কিছু একটা হবে। সেটাও হয়তো নিভে গেল।
টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্তের কাজ অলমোস্ট শেষ। আমাদের দৃষ্টিতে যে যে বিষয় আগের তদন্তে টাচ করা হয়নি সেগুলোকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।’ খুনি কারা, কেন খুন করা হয়েছে-এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখনো পারসন (ব্যক্তি) ডিটেক্ট করতে পারিনি। খুনের মোটিভ (কারণ) সম্পর্কে ধারণা পেলেও এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
এক প্রশ্নের জবাবে পিবিআই প্রধান বলেন, ‘তদন্ত শেষে পারসন ডিটেক্ট হলে চার্জশিট, আর না হলে যা হয় তাই। আমরা টাইম টু টাইম আদালতকে তদন্তের বিষয়ে অবহিত করছি।’ খুনি এখনো ডিটেক্ট না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলের আলামত নষ্ট হয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের পর মানুষজন ও সাংবাদিকরা গিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলেন। ১৩ বছর পর তদন্ত করতে গিয়ে ছবি আর ভিডিওর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’
সূত্র জানায়, ডিএনএ নমুনা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সাগর-রুনীকে হত্যায় সরাসরি দুজন ছিল। তবে তাদের শনাক্ত করতে পারেননি তদন্তকারীরা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চুরির উদ্দেশ্যে বাসায় ঢুকে খুন করা হয়-এ বিষয়টিকেই এখন মূল কারণ মনে করছেন পিবিআইর তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, যে প্রক্রিয়ায় গ্রিল কেটে বাসায় ঢুকেছে তা চোর ছাড়া সম্ভব নয়। এমনকি প্রফেশনাল কিলারের পক্ষেও এভাবে বাসায় ঢোকা সম্ভব নয়। তাই গ্রিল কাটা চোররা বাসায় ঢুকে হত্যা করেছে এমন ধারণা করছে পিবিআইও।
পিবিআইর তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী সাগরকে আগে ছুরিকাঘাত করা হয় এবং রুনীকে পরে। তদন্তে ধারণা করা হয়, সাগর বাধা দিতে পারেন এজন্য তার হাত-পা বাঁধা হয়। তার শরীরে ২৪টি ক্ষত করা হয়। ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণ হয় তার। মৃত্যুর আগে তিনি দীর্ঘ সময় গোঙান এবং বাঁচার চেষ্টা করেন। রুনী নারী হিসাবে দুর্বল। এজন্য তার হাত-পা বাঁধার প্রয়োজন মনে করেনি। হত্যার জন্য দুটি ছুরি ও একটি বঁটি ব্যবহার করা হয়। বড় ছুরিটি উভয়কেই হত্যার জন্য ব্যবহার করা হয়। ভিসেরা টেস্টের ফলাফল অনুযায়ী হত্যার আগে তাদের চেতনানাশক কিছু খাওয়ানো হয়নি।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। রুনী ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। হত্যার পর থেকে সরকারের আশ্বাসের মধ্যেই সীমিত থেকেছে তদন্ত কার্যক্রম। একে একে ব্যর্থ হয়েছে থানা পুলিশ, ডিবি ও র্যাব। দিনের পর দিন পেছানো হয়েছে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ, যা বর্তমানে ১২৩ বারে ঠেকেছে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকার সাগর-রুনী হত্যার বিচারে টালবাহানা করেছে। এমনকি সরকারের ইন্ধনেই ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এমন অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
পরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ হত্যা মামলার তদন্ত গতি পাবে এমন আশা করেছিলেন স্বজনরা। অন্তর্বর্তী সরকারও বিচারের আশ্বাস দিয়েছে। সাগর-রুনী হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে গঠন করা হয় উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স। তদন্তের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। তবুও আড়ালেই রয়ে গেছে খুনিরা।
এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে। টাস্কফোর্স যত ধরনের প্রশ্ন আছে, মানুষের যত সন্দেহ আছে, সবগুলো যাচাই-বাছাই করেছে। তদন্তের যত ক্ষেত্র আছে-যেমন ফেসবুক, অফলাইন, অনলাইন এমনকি বিভিন্ন কমেন্ট থেকে শুরু করে যত অভিযোগ আছে, সব প্রশ্নের উত্তর টাস্কফোর্স জোগাড় করেছে। হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন সংবাদপত্রে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যায় সম্পৃক্ততার বিষয়ে যাদের নাম এসেছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি হত্যা মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ দিয়েছেন আদালত। এ নিয়ে এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ ১২৩ বার পেছানো হয়েছে। ঢাকার সিএমএম আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ ঠিক করেন। তবে উচ্চ আদালত ছয় মাসের সময় দিয়েছেন।
সুত্র- যুগান্তর
এবি