ঋতুর রঙে, হৃদয়ের অনুরণনে আজ পহেলা ফাল্গুন। ঋতুর পালাবদলের সেই অনিবার্য ঘোষণা আর শীতের শুষ্কতা পেরিয়ে বসন্তের রঙিন আগমন। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ বদলালেও প্রকৃতির ভেতরে যে নীরব বিপ্লব ঘটে, পহেলা ফাল্গুন তারই উৎসবমুখর প্রকাশ। আর এ বছরও এই দিনটি মিলে গেছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে, যেন প্রকৃতি ও মানুষের হৃদয় একই সুরে বাঁধা।
বাংলা বর্ষপঞ্জির একাদশ মাস ফাল্গুন। কিন্তু আবেগের অভিধানে এটি প্রথম সারির। কারণ ফাল্গুন মানেই মধ্যবর্তী আবহাওয়া-না কনকনে শীত, না দগ্ধ গ্রীষ্ম। এমন এক আরামদায়ক পরিবেশ, যেখানে সকালের রোদ মোলায়েম, বিকেলের বাতাসে হালকা উষ্ণতা, আর সন্ধ্যায় থাকে প্রশান্তির ছোঁয়া। এই ‘মধ্যবর্তী’ চরিত্রই ফাল্গুনকে আলাদা করে। প্রকৃতির ভারসাম্য যেন মানুষকেও শেখায় অতিরিক্ততা নয়, সংযমেই সৌন্দর্য।
বসন্ত মানেই পলাশ-শিমুলের আগুনরাঙা ছটা, কৃষ্ণচূড়ার স্বপ্ন, কোকিলের ডাক। গ্রামবাংলার পথঘাটে সরিষার হলুদ, শহরের রাজপথে রঙিন পোশাক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসন্তবরণসহ সব মিলিয়ে ফাল্গুন এক উৎসবের নাম। এই বসন্তকে আমরা চিরকালীনভাবে ধারণ করেছি কবিতায়, গানে, সাহিত্যে। বসন্তের প্রেমকে নতুন ভাষা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; বিদ্রোহী চেতনায় বসন্তের আগুন জ্বালিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁদের সৃষ্টিতে বসন্ত শুধু ঋতু নয়, এক জাগরণের প্রতীক।
আজকের দিনে আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। বিশ্বজুড়ে যাকে বলা হয় Valentine's Day। পাশ্চাত্য থেকে আগত এই দিবস আমাদের সমাজেও জায়গা করে নিয়েছে। কেউ ভালোবাসার মানুষের হাতে ফুল তুলে দেয়, কেউ বন্ধুকে শুভেচ্ছা জানায়, কেউ বা পরিবারকে নিয়ে সময় কাটায়। তবে ভালোবাসার পরিধি কেবল যুগলবন্দি নয়, এটি হতে পারে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধেরও প্রকাশ।
এখন প্রশ্ন হলো আমাদের সমাজে ভালোবাসার সংজ্ঞা কী? কেবল সামাজিক মাধ্যমে ছবি বদলানো, লাল-হলুদের বাহার, নাকি বাস্তব জীবনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো? আজ যখন সমাজে বিভাজন, হিংসা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, পারিবারিক দূরত্ব বাড়ছে, তখন পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা।
ফাল্গুন প্রকৃতিকে যেমন নতুন করে সাজায়, তেমনি মানুষকেও আহ্বান জানায় আত্মসমালোচনার। আমরা কি ভালোবাসার ভাষা ভুলে যাচ্ছি? আমরা কি সহমর্মিতার জায়গা সংকুচিত করছি? এই দিনে প্রয়োজন বাহ্যিক উৎসবের চেয়ে অন্তরের পরিশুদ্ধি। ভালোবাসা মানে কেবল আবেগ নয়, দায়িত্বও। পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতাও ভালোবাসারই অংশ।
ফাল্গুনকে বলা হয় বারো মাসের সেরা মাস, তার আবহাওয়ার ভারসাম্যের জন্য, তার রঙের উচ্ছ্বাসের জন্য। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ফাল্গুন তখনই সেরা, যখন তা মানুষের মনেও বসন্ত জাগায়। আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা ভালোবাসা যেন কৃত্রিম প্রদর্শনী না হয়ে সত্যিকারের মানবিক শক্তিতে রূপ নেয়।
পহেলা ফাল্গুন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস একসঙ্গে এসে যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির মতো জীবনেও প্রয়োজন ভারসাম্য, রঙ আর মমতার সুরেলা সমন্বয়। বসন্তের এই নবপ্রভাতে জাগুক হৃদয়ের নতুন স্পন্দন; শুদ্ধ হোক অনুভব, গভীর হোক ভালোবাসার চর্চা।
এসআর