যশোরে সদর উপজেলার চুড়ামনকাটিতে শিক্ষিকা রুবিনা আলমকে হত্যা চেষ্টা মামলা ভিন্নখাতে নিতে আসামি পক্ষ পাল্টা মামলা দায়ের করেছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আব্দুস সামাদের স্ত্রী নুরজাহান বেগম মামলায় চরম মিথ্যাচার করেছেন। গোলযোগের সময় ঘটনাস্থলে না থাকা ব্যক্তিকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। এতে শিক্ষিকার পরিবারের সদস্যরা হতাশ হয়েছেন।
জানা গেছে, চুড়ামনকাটির মাদরাসা পাড়ার শাহ আলম তরফদার ওরফে রাকার মেয়ে রুবিনা আলম ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি সুনামধন্য কলেজের প্রাণী বিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষক। চাকরির সুবাদে সেখানে বসবাস করেন। ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বাবার বাড়িতে আসেন। জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে ১১ ফেব্রুয়ারি আব্দুস সামাদ, তার জামাই সোহান, স্ত্রী নুরজাহান, ছেলে গোলাম রসুল ও মেয়ে নীলা মিলে রুবিনা আলমের ওপর হামলা চালিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। এসময় সোহান ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা করে। পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। এ ঘটনায় রুবিনা আলম বাদী হয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি আব্দুস সামাদ, নুরজাহান, সোহান, গোলাম রসুল ও নীলার বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে আসামিরা জামিনে রয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, আব্দুস সামাদ জামাই সোহানের সহায়তায় ২৫/২৬ পরিবারের চলাচলের রাস্তা দখল করে দুই পাশে গেট নির্মাণের মাধ্যমে জমি জবরদখল করে। অথচ দলিলে জমির ওই অংশটি রাস্তা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। মূলত এই নিয়ে রাকা তরফদার ও জবরদখলকারী আব্দুস সামাদ গংয়ের মধ্যে শত্রুতা তৈরি হয়। এরই জের ধরে রুবিনা আলমকে হত্যা চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় ১৪ ফেব্রুয়ারি জনগণ জোটবদ্ধ হয়ে আব্দুস সামাদের অবৈধভাবে নির্মাণ করা গেট ভেঙে দেয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকা রুবিনা আলম জানান, আমাকে হত্যা চেষ্টা করে উল্টো আমাদের পরিবারকে শায়েস্তা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সামাদ গং। গত ১১ ফেব্রুয়ারি আমার ওপর হামলার পর সামাদের স্ত্রী নুরজাহান মারধরের শিকার হয়েছেন বলে কৌশলে যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন। এরপর আমার দায়ের করা মামলা নিষ্ক্রিয় করতে সামাদের স্ত্রী নুরজাহান বাদী হয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি ৭ জনকে আসামি করে পাল্টা মামলা করেন। এফআইআর নম্বর ৫৭। তিনি (রুবিনা আলম) ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন তার পিতা শাহ আলম রাকা, মা, চাঁদ সুলতানা, ভাই লিমন তরফদার, বোন লিনতা, ভগ্নিপতি ফোরকান আহমেদ জুয়েল ও চাচা বাবলু।
রুবিনা আলম জানান, মামলার এজাহারে নুরজাহান গালভরা মিথ্যাচার করেছেন। সেদিন ঘটনাস্থলে আমার ভাই লিমন তরফদার উপস্থিত না থাকলেও তাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি জনগণ জোটবদ্ধ হয়ে আব্দুস সামাদের অবৈধভাবে নির্মাণ করা গেট ভেঙে দিলেও আমাদের ওপর দোষ চাপিয়ে সেটি ১১ ফেব্রুয়ারি ঘটনা হিসেবে মামলায় চালিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের দুই বোনকে (রুবিনা আলম ও লিন্তা)) হত্যা চেষ্টার পর আবার উল্টো মামলার আসামি করা হলো। হামলাকারী সামাদ গং যখন গেট আটকে আমাকে মারধর করছিলো তখন ফোরকান প্রাচীর টপকে গিয়ে আমার জীবন রক্ষা করে। মামলায় ফোরকানকে আসামি করা হয়েছে। আমার অসুস্থ বাবা-মাকেও ছাড় দেয়া হয়নি। তিনি ঘটনার সঠিক তদন্তের দাবি করেছেন।
এদিকে, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ লে. কর্নেল ফারজানা শাকিলের দেয়া প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে- সজীব আলম (লিমন তরফদার) অত্র প্রতিষ্ঠানে ২০১৭ সাল হতে অত্যন্ত সুনামের সহিত ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড অনুযায়ী গত ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি অফিসিয়াল দায়িত্ব পালন করেন। ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে তাকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক লুৎফর রহমান খাতা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। এদিন সকাল ১০.৪০ মিনিটে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে খাতা সংগ্রহ করেন সজীব আলম। যার ভিডিও ফুটেজ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংরক্ষিত আছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত যশোরে একটি অসত্য মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওই দিন সকাল ১১টায় নাকি লিমন তরফদার (সজীব আলম) যশোরে থেকে মামলার বাদীকে পিটিয়ে আহত করেছেন।
শিক্ষিকা রুবিনা আলমের বোন জান্নাতুল ফেরদৌস লিন্তা জানান, সামাদের পরিবারের লোকজন হামলা চালিয়ে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। তাদের আক্রমণের শিকার হয়ে আমার বোন রুবিনা ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন। তাকেও মামলায় জড়ানো হয়েছে। এটা রীতিমতো পরিতাপের বিষয়।
এই বিষয়ে আব্দুস সামাদ পক্ষ জানিয়েছেন, তাদের দায়ের করা মামলা সত্য না মিথ্যা পুলিশ সঠিকভাবে ঘটনার তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে।
চুড়ামনকাটির সাজিয়ালী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এস আই আব্দুর রউফ জানান, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দুই পক্ষকে শান্ত থাকার জন্য বলা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছেন।
এসআর