কক্সবাজারের দরিয়ানগর সমুদ্রসৈকতে ভোরের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ এক অস্বস্তিকর দৃশ্য চোখে পড়ে স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ ইউনুসের। বালুচরে একদল বেওয়ারিশ কুকুর জটলা করে কিছু খুঁড়ছে। কাছে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, বালির নিচে লুকিয়ে রাখা সামুদ্রিক মা কচ্ছপের ডিম একে একে টেনে বের করছে কুকুরগুলো। দ্রুত স্থানীয় তরুণদের সহায়তায় ১২০টি ডিম অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সেহরি ও ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে বের হয়েছিলেন ইউনুস। ভোর আনুমানিক সাড়ে ছয়টার দিকে দরিয়ানগর সৈকতের একটি নির্জন অংশে ঘটনাটি তাঁর নজরে আসে। তিনি বলেন, "দেখলাম কুকুরগুলো বালির নিচে কী যেন টেনে বের করছে। কাছে গিয়ে বুঝি, মা কচ্ছপ রাতে ডিম পেড়ে গেছে। কুকুরগুলো সেগুলো নষ্ট করে ফেলছিল।"
স্থানীয় কয়েকজন তরুণকে নিয়ে তিনি দ্রুত কুকুরগুলোকে তাড়ান। বালু সরিয়ে অক্ষত ডিমগুলো সাবধানে সংগ্রহ করা হয়। পরে কক্সবাজার জেলা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলে একজন বনকর্মী ঘটনাস্থলে এসে ডিমগুলো গ্রহণ করেন।
উপকূলীয় বন বিভাগের কলাতলী বিট কর্মকর্তা কেচু মারমা বলেন, "উদ্ধার করা ডিমগুলো বন বিভাগের হ্যাচারিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে সেগুলো নিরাপদে সাগরে ছেড়ে দেওয়া হবে।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক কচ্ছপ সাধারণত গভীর রাতে নিরিবিলি ও তুলনামূলক নিরাপদ স্থান খুঁজে ডিম পাড়তে আসে। বালিতে গর্ত করে ডিম পেড়ে আবার বালি চাপা দিয়ে সাগরে ফিরে যায়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে। এরপর নবজাতক কচ্ছপগুলো নিজেরাই সাগরের দিকে ছুটে যায়।
পরিবেশবাদীদের মতে, সৈকতে কুকুর নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ডিম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। একই সঙ্গে প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট এলাকাকে ‘নো-ডিস্টার্ব জোন’ ঘোষণা ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
পরিবেশকর্মী এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, "ডিম পাড়ার মৌসুমে সৈকতের কিছু অংশে রাতের আলোকসজ্জা সীমিত রাখা দরকার। শব্দদূষণ কমাতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে—বালিতে অস্বাভাবিক গর্ত দেখলে তা নষ্ট না করে যেন বন বিভাগকে জানানো হয়।"
সামুদ্রিক কচ্ছপ সাগরের খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তারা জেলিফিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী খেয়ে খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণে রাখে। দরিয়ানগরের ভোরের সেই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়—সৈকতের বালিতে চাপা পড়ে থাকা জীবনকে রক্ষা করতে কখনও কখনও একজন সচেতন মানুষের চোখই যথেষ্ট।
এনআই