ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার গালুয়া গ্রাম। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। পাখিদের কোলাহল থেমে গেলে এক গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন এক মসজিদ যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘জ্বীনের মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত। ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও লোকবিশ্বাস মিলিয়ে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে এই ‘গালুয়া পাকা মসজিদ’।
স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে এক প্রাচীন কাহিনী। তাঁদের বিশ্বাস, বাংলা ১১২২ সালে মাহমুদ জান আকন্দ ঘন জঙ্গলের ভেতরে এই মসজিদটি আবিষ্কার করেন। জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদ ও এর আশপাশে বিশালাকার সব সাপ বিচরণ করছে। স্থানীয়দের অনেকের ধারণা, ওই সাপগুলো ছিল ‘জ্বীনের রূপ’। পরে সেখানে নামাজের উদ্যোগ নেওয়া হলে সাপগুলো নীরবে সরে যায়। সেই ঘটনার পর থেকেই মসজিদে নিয়মিত নামাজ শুরু হয় এবং ‘জ্বীনের মসজিদ’ নামটি জনমুখে প্রচলিত হয়ে ওঠে। কেউ বিষয়টিকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে মানেন, আবার কেউ দেখেন নিছক লোককথা হিসেবে।
তবে শুধু লোকগাথাই নয়, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেও মসজিদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই স্থাপনাটিতে সুলতানি ও মুঘল আমলের স্থাপত্যরীতি স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। ব্যবহৃত ইট, চুন-সুরকির গাঁথুনি এবং সুনিপুণ নকশায় প্রাচীনত্বের ছাপ সুস্পষ্ট। সময়ের আবর্তে কারুকাজের অনেকাংশ ক্ষয়ে গেলেও মসজিদের আদি গাম্ভীর্য এখনো অটুট রয়েছে।
ঐতিহাসিক এই মসজিদটি ভাণ্ডারিয়া-রাজাপুর মহাসড়ক থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গালুয়া ইউনিয়নে অবস্থিত। সবুজে ঘেরা গ্রামীণ পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করেন।
মসজিদের ইমাম মাওলানা ওবায়দুল হক বলেন, “অনেকে কৌতূহল থেকে এটি দেখতে আসেন। তবে আমরা সবসময় মনে করিয়ে দিই, এটি মহান আল্লাহর ঘর। নিয়মিত নামাজ ও ইবাদতই এই মসজিদের আসল পরিচয়।”
ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৯৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটিকে সংরক্ষণের আওতায় নেয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও যথাযথ সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে স্থাপনাটির আদি ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
লোকবিশ্বাস, ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ এই গালুয়া পাকা মসজিদ। গবেষক ও পর্যটকদের কাছে এটি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও সময়োপযোগী সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের এই নীরব সাক্ষী হয়তো একদিন কেবল গল্পের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
এনআই