বাংলাদেশ আজ এক অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা ছাড়িয়ে ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। ২০৪১ সালের উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নও এখন আর কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার লক্ষ্য। কিন্তু এই যাত্রাপথে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন কোথায়? বড় শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে ওঠে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং উদীয়মান স্টার্টআপ খাতের ওপর। এই বাস্তবতায়, দেশের সর্বোচ্চ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআই (FBCCI) কীভাবে এসএমই ও স্টার্টআপ বিপ্লবের নেতৃত্ব নিতে পারে—সেটিই আজকের আলোচনার মূল বিষয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি (২০১৩) অনুযায়ী দেশে প্রায় ৭৮ লাখের বেশি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার প্রায় ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ। পরবর্তী বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, এসএমই খাত জাতীয় কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি সৃষ্টি করে এবং মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ অবদান রাখে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের এসএমই খাতকে কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমও গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বিকশিত হয়েছে। লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলো প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক ও স্থানীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যদিও ২০২২ ও ২০২৩ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যায়, তবুও ফিনটেক, ই-কমার্স, লজিস্টিকস ও হেলথটেক খাতে স্টার্টআপ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এই দুই খাত—এসএমই ও স্টার্টআপ—প্রকৃতপক্ষে একই প্রবৃদ্ধি চক্রের দুই ধাপ। স্টার্টআপ হলো উদ্ভাবনের সূচনা, আর এসএমই হলো উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের বিস্তার। কিন্তু সমস্যাও কম নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই ক্রেডিট পলিসি ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, অর্থায়ন প্রাপ্তি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ সুদের হার, জামানতভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা, দীর্ঘসূত্রতা—এসব কারণে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। আন্তর্জাতিক অর্থ কর্পোরেশন (IFC)-এর একটি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের এসএমই খাতে অর্থায়ন ঘাটতি উল্লেখযোগ্য এবং আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের বাইরে অনেক উদ্যোক্তা রয়ে গেছেন।
এই বাস্তবতায় এফবিসিসিআই-এর ভূমিকা কেবল প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটি হতে পারে নীতিনির্ধারণে একটি শক্তিশালী “পলিসি থিংক ট্যাংক”। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শীর্ষ চেম্বারগুলো গবেষণা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং নীতি প্রস্তাবনার মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করে। বাংলাদেশেও এফবিসিসিআই নিয়মিত প্রাক-বাজেট প্রস্তাবনা দেয়, কিন্তু এসএমই ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম নিয়ে আরও কাঠামোগত ও তথ্যভিত্তিক কাজ প্রয়োজন।
প্রথমত, একটি জাতীয় এসএমই ও স্টার্টআপ ডেটা অবজারভেটরি গঠন করা জরুরি, যেখানে খাতভিত্তিক তথ্য, অর্থায়ন প্রবাহ, কর্মসংস্থান প্রবণতা ও আঞ্চলিক বৈষম্য বিশ্লেষণ করা হবে।
দ্বিতীয়ত, বিকল্প অর্থায়ন—যেমন ভেঞ্চার ডেট, ক্লাস্টার ফান্ড, ক্রাউডফান্ডিং ও ইকুইটি মার্কেট—নীতিগতভাবে উৎসাহিত করার জন্য এফবিসিসিআই সুসংগঠিত সুপারিশ দিতে পারে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ইতোমধ্যে এসএমই বোর্ড চালু করেছে, যা ছোট ও মাঝারি কোম্পানির পুঁজিবাজারে প্রবেশ সহজ করে। এই উদ্যোগকে আরও কার্যকর করতে চেম্বারের সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তি রূপান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে ডিজিটাল দক্ষতা ছাড়া প্রতিযোগিতা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে আইসিটি রপ্তানি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের সাফল্য প্রমাণ করে, মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের ফল দ্রুত আসে। এফবিসিসিআই তার সদস্য সংগঠনগুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে পারে।
চতুর্থত, রপ্তানি বহুমুখীকরণে এসএমই ও স্টার্টআপকে যুক্ত করা অপরিহার্য। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাত মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে (রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, EPB)। দীর্ঘমেয়াদে এই একমুখী নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, এগ্রো-প্রসেসিং, আইটি সার্ভিস, ফার্মাসিউটিক্যালস ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমি—এসব খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে নীতি সহায়তা ও বাজার সংযোগ তৈরি করতে হবে।
সবশেষে, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিপ্লব টেকসই হয় না। এসএমই নীতিমালা, কর কাঠামো ও ব্যবসা নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও সরল ও ডিজিটাল করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের “ডুয়িং বিজনেস” সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অতীতে চ্যালেঞ্জপূর্ণ ছিল—এটি প্রমাণ করে যে ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন এখনো অগ্রাধিকার দাবি করে।
এসএমই ও স্টার্টআপ বিপ্লব কোনো তাৎক্ষণিক স্লোগান নয়; এটি একটি কাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়া। এফবিসিসিআই যদি প্রতিনিধিত্বের গণ্ডি পেরিয়ে গবেষণা, নীতি প্রস্তাবনা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও দক্ষতা উন্নয়নে নেতৃত্ব দেয়, তবে এটি সত্যিকার অর্থেই দেশের প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন হতে পারে। বড় শিল্প অর্থনীতিকে গতি দেয়, কিন্তু ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ তাকে প্রাণ দেয়। বাংলাদেশের আগামী অধ্যায় নির্ধারিত হবে উদ্যোক্তাদের হাত ধরে—যারা ছোট থেকে শুরু করে বড় স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন নীতি, কাঠামো ও নেতৃত্ব। আর সেখানেই এফবিসিসিআই-এর সামনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ—একটি সংগঠন থেকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার।
প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন হয়তো তৈরি হচ্ছে নীরবে—কারখানার ছোট ঘরে, কো-ওয়ার্কিং স্পেসে, কিংবা একটি তরুণ উদ্যোক্তার ল্যাপটপে। এখন প্রশ্ন একটাই: আমরা কি সেই ইঞ্জিনকে সঠিক জ্বালানি দিতে প্রস্তুত?
লেখক: সাকিফ শামীম, এফএলএমআই (অর্থনীতিবিদ) ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।
এবি