ফাল্গুনের এই খরতাপে চারপাশ যখন শুষ্ক, ঠিক তখনই ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় রাক্ষুসী রূপ ধারণ করেছে মধুমতি। উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামে হঠাৎ শুরু হওয়া এই ভাঙনে মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি ও অসংখ্য গাছপালা। এতে শেষ সম্বল হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে ভাঙনরোধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরিভিত্তিতে বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার পাশাপাশি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে আকষ্মিক শুরু হওয়া এই ভাঙন প্রায় ২০০ মিটার এলাকা জুড়ে অব্যাহত রয়েছে। শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে নদীপাড়ের মানুষ তাড়াহুড়ো করে ঘরবাড়ি ও স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন। চোখের সামনে নিজেদের মাথাগোঁজার ঠাঁই হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ শেখ ও মনা শেখের মতো অনেকেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কৃষ্ণপুর গ্রামে নদী রক্ষায় একটি ডান-তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। গত বছর বাঁধটিতে ধস দেখা দিলে চলতি মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড সেটির সংস্কার কাজ শুরু করে। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যায় সংস্কারাধীন বাঁধের ডাম্পিং করা স্থানেই পুনরায় ধস শুরু হয়। এতে হিল্লাল শেখ, টুলু শেখ ও ফারুক আহমেদসহ বেশ কয়েকজন বাসিন্দা তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। বর্তমানে খোলা আকাশই তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। এছাড়া ভাঙন আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী শতশত পরিবার।
নদী ভাঙনে গৃহহারা দিনমজুর সোহাগ শেখ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, 'ভ্যান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। নিজের বলতে আর কোনো জমিজমা নেই। মাথাগোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও আজ মধুমতি কেড়ে নিল। এখন এই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?'
একই গ্রামের মনা শেখের স্ত্রী নেহার বেগম তার শেষ সম্বল হারানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'চোখের সামনেই সবকিছু নদীর পেটে চলে গেল। আমার তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, স্বামী আর আমি এই ভিটাটুকু আঁকড়েই ছিলাম। এখন আমাদের আর কিছুই রইল না, খোলা আকাশই এখন আমাদের ঠিকানা।'
এদিকে শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত নূর মৌসুমি ও ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, 'স্থায়ী বাঁধ মেরামতের কাজ চলাকালীন হঠাৎ করেই প্রায় ১০০ মিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের সার্ভে টিম কাজ করছে। নদীর গভীরতা প্রায় ৩০ মিটার থেকে শুরু হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত নূর মৌসুমি সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, 'আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রাথমিকভাবে খাদ্য সহায়তা ও ঢেউটিন প্রদান করা হবে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে পরবর্তী পুনর্বাসনের বিষয়েও আমরা সচেষ্ট থাকব।'
এফএস