বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের রায়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশ চলবে। কিন্তু একটি দল জাল ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে। নিরীহ মা-বোনদের থেকে বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। যারা নির্বাচনের আগে প্রতারণা করছে, তারা কিভাবে সৎ মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টায় বরিশাল নগরের ঐতিহাসিক বেলস পার্ক ময়দানে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি ‘গুপ্ত’ দলের লোকেরা জালেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে মন্তব্য করে বলেন, বর্তমানে দেশে নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে। বাংলাদেশে নারী পুরুষ মিলে মাঠে কাজ করে। নতুন জালেম যাদের মানুষ গুপ্ত হিসেবে চেনে সেই জালেমদের নেতা নারীদের নিয়ে কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেছেন। এরা ইসলামের রাজনীতি করে কিন্তু এরা নারীদের নিয়ে কিভাবে কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করে। কানো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ না করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দুঃখের বিষয় যারা জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তাদের ভাষায় একটি রাজনৈতিক দল কথা বলছে। জনগণ সেই রাজনৈতিক দলটিকে গুপ্ত নামে চেনে।
তিনি বলেন, জালেমদের নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, বাংলাদেশের নারীদের অত্যন্ত কলঙ্কিত শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেই দলের দেশের মা-বোনদের প্রতি শ্রদ্ধা নেই, তাদের কষ্টের প্রতি সম্মান নেই, তাদের থেকে বাংলাদেশের অগ্রগতি আশা করা যায় না।
তারেক রহমান বলেন, নারীদের পেছনে ফেলে, নারীদের ঘরে বন্ধ করে রেখে কোনোভাবে সামনে এগোনো যাবে না। দেশ গড়তে হলে নারী-পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।
তিনি বলেন, গুপ্ত সংগঠনের নেতারা ভুয়া সিল ছাপাচ্ছে, বিভিন্ন প্রেসে জাল ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে। নির্বাচনের আগেই যারা অনৈতিক কাজ করে ভোটকে প্রভাবিত করছে, তারা কী করে সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে? আইডি হ্যাকের নামে মিথ্যা কথা বলে যারা, তারা সৎ মানুষ হতে পারে না।
তারেক রহমান আরও বলেন, ১৫ বছরের ভোটাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জনগণ নানা নিপীড়ন ও হত্যার শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, “যারা দেশের মালিক মনে করতেন, তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। জনগণই এখন দেশের নিয়ন্ত্রক। ১২ ফেব্রুয়ারি মানুষ তাদের নির্বাচিত করবে যারা জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করবে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, ভোট গ্রহণের দিনে কেউ ষড়যন্ত্র করলে তা ব্যর্থ হবে। তিনি জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে বলেন, “শহীদদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠন ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি জনগণকে সচেতন ও সঠিক ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। নারী ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তিনি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, নবীর স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা:) একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন। বদরের যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা:) সৈনিকদের সরঞ্জাম ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, নারীদের ঘরে বন্দি রাখলে দেশ এগোবে না। বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার অবদান উল্লেখ করেন।
বরিশালের কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হিমাগার স্থাপন, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে বীজ ও সার বিতরণ এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। তরুণদের প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করা হবে।
তিনি গুপ্ত দলের উদ্দেশ্যে বলেন, ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে জনগণের পাশে থাকতে হবে। সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনের আগে অনৈতিক কাজ করলে কেউ সৎ শাসন দিতে পারবে না। ভোট অধিকার হাইজ্যাক করতে দেয়া যাবে না।
এ সময় তারেক রহমান ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করান। বলেন, “আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নজর রাখুন, ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা আপনাদের দেখাশোনা করবে।” জনসভায় নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। তার বক্তব্যে জনগণের ক্ষমতার গুরুত্ব ও দলের শক্তি স্পষ্ট হয়।
দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুপুর ১১টা ৫৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে বরিশাল স্টেডিয়ামের আউটার মাঠে অবতরণ করেন। হেলিকপ্টার থেকে নামার পর তারেক রহমানকে স্বাগত জানান বরিশাল বিভাগ ও জেলার শীর্ষ নেতারা।
তারেক রহমানকে এক নজর দেখতে সকাল থেকেই বের্লেস পার্ক ও আশপাশের এলাকায় বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার লাখো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। স্বাগত জানান বরিশাল বিভাগের শীর্ষ নেতা-কর্মীরা। এরপর সেখান থেকে গাড়িতে করে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে সভা মঞ্চে পৌঁছান তিনি।
এসময় সড়কের দুই পাশ থেকে নেতাকর্মীরা তাকে নিয়া উচ্ছ্বাসিত হয়ে শ্লোগান দিতে থাকে। মঞ্চে উঠে তিনিও হাত নেড়ে জনসমাবেশে উপস্থিত লাখো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অভিবাদন গ্রহণ করেন। এর আগে বেলা ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লা আমান প্রথম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন। বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক জনসভায় সভাপতিত্ব করেন। মহানগরের সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার ও বরিশাল দক্ষিণ জেলার সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন যৌথভাবে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দির আহমেদ বীর বিক্রম, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার, উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনের বিএনপি ও জোট মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থীরা সহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সর্বশেষ ২০০৬ সালে বরিশাল সফর করেছিলেন তারেক রহমান। তখন তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। এবার তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে বরিশাল আসায় দক্ষিণাঞ্চলে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে বলে দলীয় নেতারা মন্তব্য করেছেন। তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনও নিরাপত্তা জোরদার করেছে। মাঠ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কড়া নজরদারিতে রয়েছেন।
ইখা