আকাশ পথে দেশের প্রধান বহির্গমন পথ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যায় রেকর্ড গড়লেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অব্যবস্থাপনা ও ভোগান্তি। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর অনিশ্চয়তা এবং আকাশচুম্বী বিমানভাড়ার কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী কর্মীরা। বার্ষিক ৮০ লাখ যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে এই বন্দর এখন প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রীর চাপ সামলাচ্ছে!
বিমানবন্দর সূত্রের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন অন্তত ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রী। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে ছিল ১ কোটি ১৭ লাখ। অর্থাৎ এক বছরে যাত্রী বেড়েছে প্রায় ১.৮ শতাংশ। মোট যাত্রীর বড় অংশই (১ কোটি ৩১ হাজার ২০০ জন) আন্তর্জাতিক রুটের, যা মূলত প্রবাসীদের ওপর বিমানবন্দরের নির্ভরশীলতাকে স্পষ্ট করে। বর্তমানে সক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী সেবা দিচ্ছে বিমানবন্দরটি! যাত্রী বাড়লেও বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল এখনো চালু না হওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে এই ভোগান্তি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। অপারেটর নিয়োগ নিয়ে জটিলতা থাকায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এর সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ফলে আধুনিক সেবার সুফল পেতে আরও দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের।
অন্যদিকে সরকারের নানা নির্দেশনার পরও টিকিটের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। ট্রাভেল এজেন্টরা জানিয়েছেন-মধ্যপ্রাচ্যের টিকিটের দাম ৩৫–৪০ হাজার থেকে বেড়ে বর্তমানে ৭৫–৮০ হাজার টাকায় ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক রুটের ৬৬ শতাংশ বাজার বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে থাকায় ভাড়া নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিমানের সক্ষমতা বাড়িয়ে আসন সংকট দূর না করলে ভাড়া কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে শীতকালীন ঘন কুয়াশার সাথে যোগ হয়েছে কারিগরি ত্রুটি। গত ২৯ অক্টোবর রানওয়ের লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আইএলএস (ILS) ক্যাটাগরি-২ থেকে ১-এ নেমে এসেছে। এতে ৫০০ মিটারের পরিবর্তে ১,২০০ মিটার দৃশ্যমানতা ছাড়া ফ্লাইট নামতে পারছে না। ফলে প্রায়ই ফ্লাইট ডাইভার্ট করতে হচ্ছে, যা পরবর্তীতে টার্মিনালে অতিরিক্ত ভিড় ও ট্রলি সংকটের সৃষ্টি করছে।
কাতার প্রবাসী এক যাত্রী সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, আমাদের বিমান বন্দরে যত বিমান উঠানামা করে তার কয়েকগুন আন্তর্জাতিক বিমান কাতারের বিমান বন্দরে উঠানামা করে। তারপরও সেখানে কোন ভোগান্তির শিকার হতে হয়না । এর প্রধানতম কারণ সেখানে সব কিছু নিয়মের মধ্যে হয় এবং যারা দায়িত্বশীল আছেন তারা তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করেন। আর আমাদের দেশে আসলে এটা বিমান বন্দর না কোন হাটবাজারের দৃশ্য দেখে বুঝার উপায় নেই। ডিজিটাল প্রযুক্তি বসানো হলেও সেগুলোর ব্যবহার কার্যত না হওয়ায় সময় নষ্ট হচ্ছে। এতে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ই-গেটে পাসপোর্ট স্ক্যান করার সঙ্গে সঙ্গে গেট খুলে যায়। এরপর যাত্রী ই-গেটের মনিটরে তাকালে পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই হয়। এ প্রক্রিয়া শেষে যাত্রীকে যেতে হয় ইমিগ্রেশন পুলিশের ডেস্কে। সেখানে আবার তাঁর তথ্য যাচাই করা হয়। ছবি তোলা ও প্রয়োজনীয় ভ্রমণ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখার পর পাসপোর্টে বহির্গমন সিল দেওয়া হয়।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ই-গেট ও ইমিগ্রেশন পুলিশের সার্ভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নেই। এ জন্য ই-গেট পার হয়েও যাত্রীকে আবার ইমিগ্রেশন ডেস্কে যেতে হচ্ছে।
জানা যায়, সাধারণত বিদেশগামী যাত্রীর নাম-পরিচয়, পাসপোর্ট, ভিসা নম্বরসহ ২১ ধরনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিললে তিনি ই-গেটের চার ধাপ পেরোতে পারবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে বিমানবন্দরে দায়িত্বরত অন্য কোনো কর্মকর্তার সহযোগিতা তাঁর লাগার কথা নয়। ই-গেটই বলে দেবে যাত্রীর সব তথ্য ঠিক আছে। অথচ সেখানে ম্যানুয়্যালি আবার কাজ করতে হচ্ছে ফলে বাড়তি যাত্রীদের সামলানোর ক্ষেত্রে ই-গেট যেভাবে ভুমিকা রাখতে পারতো সেভাবে পারছে না।
এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রীদের দ্রুত ও আধুনিক ইমিগ্রেশন সেবা দিতে ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ই-গেট চালু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও দুটি স্থলবন্দরে মোট ৪৪টি ই-গেট স্থাপন করা হয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ২৬টি ই-গেট রয়েছে।
কেন ই-গেটের সুফল যাত্রীরা পাচ্ছেন না– এমন প্রশ্নে ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ই-গেটে যাত্রীর বিদেশযাত্রার সরকারি আদেশ, শ্রম ভিসায় যাদের জনশক্তি, তাদের কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সনদ, গন্তব্যস্থলের ঠিকানা বা নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই যাত্রীদের ইমিগ্রেশনে এসবির ডেস্কে গিয়ে এসব তথ্য যাচাই করতে হয়। এ জন্য পুরোপুরি ই-গেটের মাধ্যমে যাত্রীর ইমিগ্রেশন শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এতসব সংকটের মধ্যেও কিছু আশার কথা শুনিয়েছেন আরএমএমআরইউ-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি জানান- সার্বক্ষণিক ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি ও হটলাইন চালুর ফলে হয়রানি কিছুটা কমেছে। লাগেজ হ্যান্ডলারদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য দুটি বিশেষ লাউঞ্জ ও ভর্তুকি মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ জানান, বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ট্রলি সংকট ও যানজটকে তিনি সাময়িক বলে উল্লেখ করেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কড়া তল্লাশিকে জরুরি বলে দাবি করেন।
পিএম