চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ আনুকে অপহরণের পর গুম ও হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ইসমাইলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ।
শুক্রবার চট্টগ্রাম শাহ্ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে রোববার। নিহত আমান উল্লাহ আনুর শ্যালক ইসমাইলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে পালিয়ে ছিলেন এবং আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে যাতায়াত করতেন।
গ্রেপ্তার হওয়া ২৫ বছর বয়সী ইসমাইলুর রহমান ছনুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আমিরপাড়ার মৃত গোলাম রহমানের ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমান উল্লাহ আনুকে অপহরণ ও গুম করার পর মামলার এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি ইসমাইলুর রহমান মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইয়ে পাড়ি জমান। ২০১৯ সালে দেশ ছাড়ার পর তিনি মাঝেমধ্যেই দেশে আসতেন এবং আবার প্রবাসে ফিরে যেতেন।
যেহেতু মামলাটি পার্শ্ববর্তী আনোয়ারা থানায় দায়ের করা হয়েছিল, তাই আসামির এই যাতায়াত ঠেকাতে মামলার বাদী ও নিহত আমান উল্লাহ আনুর বড় বোন মমতাজ বেগম ইমিগ্রেশন পুলিশ বরাবর একটি লিখিত চিঠি দেন।
ইসমাইলকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েত চৌধুরী জানান, দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর ইসমাইলুর রহমান প্রবাস থেকে দেশে ফিরলে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হন।
ওসি জুনায়েত চৌধুরী আরও জানান, ইমিগ্রেশন পুলিশ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আসামিকে আনোয়ারা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। তাকে ইতোমধ্যে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং অধিকতর তদন্তের স্বার্থে ইসমাইলুর রহমানের ৫ থেকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হবে বলে পুলিশ কর্মকর্তা জুনায়েত চৌধুরী উল্লেখ করেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, আমান উল্লাহ আনুকে হত্যার পর লাশ গুমের ঘটনায় ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশীদ এবং তার ছোট ভাই ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর কবিরসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন মমতাজ বেগম। গত ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রাম চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলাটি করা হয় এবং আদালত তা আমলে নিয়ে আনোয়ারা থানাকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন প্যানেল চেয়ারম্যান আরফাতুল ইসলাম এমরান, পুতু চৌধুরী, ইউনিয়ন মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি আবদুল আজিজ টিপু, আবদুল মোমেন, আবদু সাত্তার, মো. হেলাল উদ্দিন এবং রোজিনা আক্তার। মামলার এজাহারে মমতাজ বেগম উল্লেখ করেছেন, আসামিরা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তারা একটি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের সদস্য।
এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে চট্টগ্রাম শহর থেকে বাঁশখালী ফেরার পথে আমান উল্লাহ আনুকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি আনোয়ারা থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়।
২০ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হলেও টাকা দেওয়ার পর আমান উল্লাহ আনুকে ছাড়া হয়নি। এরপর ২০১৯ সালের ৩ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাকে ছনুয়া ইউপি চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশীদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশীদের নির্দেশে তাকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
এর আগে ২০১৯ সালের ৪ মার্চ চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার না পেয়ে আদালতে মামলা করেছিলেন মমতাজ বেগম। তখন আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিলেও আসামিদের ভয়ভীতি ও হুমকির কারণে বাদী মমতাজ বেগম তদবির করতে ব্যর্থ হন, ফলে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
মমতাজ বেগম জানান, আসামিরা আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল এবং স্থানীয়রা তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলায় সাক্ষী হতেও ভয় পেতেন।
মমতাজ বেগম আরও বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের পতনের পর গুম-খুনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তিনি ভাই আমান উল্লাহ আনু হত্যার বিচারের আশায় দীর্ঘ সময় পর পুনরায় মামলাটি দায়ের করেছেন।
এসআর