কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত কাটা খালটি পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এতে কৃষকদের পানির অভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় ৪৮ বছরের পুরোনো এই স্মৃতি নিশ্চিহ্ন হয়ে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
জালালপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে বছরের ফুল সংলগ্ন আড়িয়াল খাঁ নদী থেকে খালটির উৎপত্তি হয়ে লোহাজুরী ইউনিয়নের অরিয়াধর বাজার সংলগ্ন এলাকায় কৃষিজমিতে মিলিত হয়েছে। প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি।
দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারের কাছে খালটি পুনঃখনন করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী। পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখতে খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে শহীদ জিয়ার স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে সংরক্ষণের দাবিও জানিয়েছেন।
স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, সময়টা ছিল ১৯৭৮ সালের দিকে। সে সময় খালটি খননের জন্য সরাসরি হেলিকপ্টারে করে জালালপুর এলাকায় এসেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সঙ্গে ছিলেন তার রাজনৈতিক সচিব (পিএস), তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসুজ্জামান খোকন এবং প্রয়াত জালালপুর ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপতি শ্রমিকদের সঙ্গে নিজ হাতে কোদাল নিয়ে মাটি কাটায় অংশ নেন। পরে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। এ স্মৃতি এখনো তখনকার শ্রমিক ও এলাকাবাসীর মনে অমলিন হয়ে জ্বলজ্বল করছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিজের হাতে মাটি কাটা দেখে শ্রমিকরাও বিস্মিত হন। তিনি প্রটোকল ভেঙে সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। ফলে আন্তরিকতার সঙ্গে সবাই দ্রুত খাল খননের কাজ শেষ করতে পেরেছিলেন। বছরের পর বছর ধরে মানুষ এর সুফল পেয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় দুই প্রবীণ ব্যক্তি সুরুজ মিয়া (৭৪) ও মোহাম্মদ আলী (৬৮) বলেন, সেদিন জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টার থেকে নেমেই জনতার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খাল খননের উদ্বোধন করেন। শরীরে কাদা মাটি নিয়েই উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। সেদিন এত নারী-পুরুষের উপস্থিতি ছিল যে আজও তা আমাদের মনে আছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, খালের একদিকে জালালপুর ইউনিয়ন, অপরদিকে লোহাজুরী ইউনিয়ন স্পর্শ করেছে। বর্তমানে খালের বিভিন্ন অংশ মাটি জমে ভরাট হয়ে আছে। কিছু স্থানে পানি থাকলেও প্রবাহ না থাকায় কচুরিপানায় ঢেকে রয়েছে। অধিকাংশ অংশ মাটি জমে প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। একসময় বছরে তিনটি ফসল হতো, কিন্তু বর্তমানে বোরো ধান ছাড়া অন্য মৌসুমি ফসল করতে পারছেন না কৃষকরা। খালের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল ঐতিহাসিক কুঠির বিলসহ আরও ছোট-বড় খাল। এসব খালে মাটি জমে যাওয়ার ফলে বর্ষায় নদীতে পানি নামতে পারে না। ফলে কোথাও কোথাও পানি জমে থাকে এবং কৃষকরা ফসল আবাদ করতে পারেন না। এ নিয়ে কৃষকদের দুঃখের শেষ নেই।
৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের আশপাশের জমির পরিমাণ প্রায় ২.৫ বর্গকিলোমিটার (৬১৮ একর)। এটি পুনঃখনন হলে লোহাজুরী পূর্বচর, অরিয়াধর, দশপাখি ও জালালপুর এলাকায় বর্ষার পানি সহজেই নদীতে নামতে পারবে। পাশাপাশি পানি প্রবাহ ও সংরক্ষণ থাকলে এসব এলাকায় কৃষকরা বছরে একাধিক ফসল ফলাতে পারবেন বলে তারা জানিয়েছেন।
খালের পাশেই জমিতে কাজ করছিলেন কৃষক সাইদুর রহমান মানিক (৬৬)। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সামনে আমাদের নিচু জমি রয়েছে। ফাল্গুনী ফসল করতে পারি না। শুধু বোরো ফসলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। খাল-বিল ভরাট হয়ে দখল হয়ে যাচ্ছে। আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান আমাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। এখন তার ছেলের দিকে তাকিয়ে আছি।
পাশাপাশি জমিতে কাজ করা কৃষক জজ মিয়া (৫৫) বলেন, শহীদ জিয়ার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তার ছেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের দাবি—এই কাটা খালটি যেন আবার আগের রূপ ফিরে পায়। এতে পানি থাকলে বছরে তিনটি ফসল করতে পারব। কয়েক হাজার কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে।
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজের সঙ্গে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, “আপনার কাছ থেকেই প্রথম বিষয়টি জানলাম। স্থানীয় কৃষকদের দাবির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখব। ঐতিহাসিক কাটা খালটি পুনঃখননের বিষয়টি বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি অবহিত করব।”
ইখা