অভাব, হতাশা আর ব্যর্থতার গ্লানি পেছনে ফেলে জিআই তারের নেট তৈরি করে সফলতার মুখ দেখেছেন ভালুকা উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা মামুন। মাত্র বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ আজ তাকে এনে দিয়েছে স্বাবলম্বী জীবনের স্বাদ।
মামুন ভালুকা উপজেলার ধীতপুর ইউনিয়নের মীর বাড়ি এলাকার মৃত মীর গোলাম রব্বানীর ছেলে। এইচএসসি পাস করে বিএ-তে ভর্তি হলেও আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে পুকুরে মাছ চাষ ও লেয়ার মুরগি পালন করে আর্থিকভাবে লোকসানের মুখে পড়েন। টানা তিন থেকে চার বছর কোনো ব্যবসায় হাত দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না তিনি। হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছিল তার।
এক পর্যায়ে ইউটিউবে ভিডিও দেখে জানতে পারেন, স্বল্প খরচে জিআই তারের নেট তৈরির মেশিন কিনে কাজ শুরু করা যায়। সেই ভাবনাই বদলে দেয় তার জীবন। নিজের সাহস আর উদ্যোগকে পুঁজি করে তিনি ছুটে যান চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখানে গিয়ে জিআই তারের নেট তৈরির একটি মেশিন কিনে কয়েক দিন থেকে হাতে-কলমে কাজ শেখেন। পরে নিজ ঘরের বারান্দায় মেশিন বসিয়ে শুরু করেন নেট তৈরির কাজ।
মামুন জানান, শুরুতে আশপাশের মানুষ কৌতূহল নিয়ে তার মেশিন দেখতে আসত। গ্রামের মানুষ আগে ভাবতেই পারেনি যে জিআই তার দিয়ে ক্ষেত-খামারের টেকসই বেড়া করা সম্ভব। প্রথমে নিজের বাগানে জিআই তারের নেট দিয়ে বেড়া দেন তিনি। কিন্তু শুরুতে দীর্ঘ ছয় থেকে সাত মাস কোনো অর্ডার পাননি।
হাল না ছেড়ে তিনি লিফলেট ছাপিয়ে গফরগাঁও, ত্রিশাল, ভালুকা ও ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় দোকানের দেয়ালে লাগান। পাশাপাশি অনলাইনেও প্রচারণা চালান। এরই ফলস্বরূপ ধীরে ধীরে আসতে থাকে অর্ডার। কেউ ফোন করে, কেউ আবার সরাসরি এসে নেট তৈরি কাজ দেখে যান।
বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে গড়ে বিশ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা আয় করছেন মামুন। অর্ডার বেশি হলে আয়ও বাড়ে। তার কারখানায় নেট বুননের কাজে যুক্ত হয়েছে আশপাশের দরিদ্র পরিবারের স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা। তারা অবসর সময়ে হাত দিয়ে নেট বুননের কাজ করে নিজেদের খাওয়া ও পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছে।
নেট বুননের কাজে যুক্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, কাজটি তুলনামূলক সহজ। স্কুল বন্ধ থাকলে বা অবসর সময়ে তারা কাজ করে। এতে করে খাতা-কলম কেনা ও পড়াশোনার খরচের টাকা জোগাড় হয়।
তবে করোনাভাইরাসের সময় কাজ কিছুটা কমে গিয়েছিল। বর্তমানে তারের দাম বেড়ে যাওয়ায় নেটের অর্ডারও আগের তুলনায় কম আসছে বলে জানান মামুন। তারপরও দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে জিআই তারের নেটের অর্ডার গ্রহণ করা হচ্ছে। কুরিয়ার পরিবহনের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে নেট পৌঁছে দেওয়া হয়।
নেট কিনতে আসা মো. ফয়সাল বলেন, বাড়ির আঙিনায় স্থায়ী বেড়ার জন্য জিআই তারের নেট খুবই ভালো। আমরা অনেক দূর থেকে নেটের অর্ডার দিয়েছি। ভালো মানের জিআই তারের বেড়া ১০ থেকে ১৫ বছরেও নষ্ট হয় না।
মামুন বলেন, সরকারিভাবে যদি অর্থনৈতিক সহায়তা ও সুদৃষ্টি পাওয়া যায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিধি আরও বড় করা সম্ভব। এতে অনেক বেকার ও দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এসআর