দ্বারপ্রান্তে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজ করছে ব্যস্ততা ও উত্তেজনা। কে হবেন আগামী সংসদ সদস্য এ নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ ও আলোচনা। তবে বিজয়ী যেই হোন না কেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা সাধারণ ভোটারদের।
নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নওগাঁ জেলার ৭৮২টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৬৪টিকে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা পুলিশ। এসব কেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও এখনো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন হয়নি। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও জানেন না আদৌ ক্যামেরা বসানো হবে কিনা।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মোট ৩২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৫৯২ জন। এর মধ্যে হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২১ জন।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ৩৬৪টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও অন্যান্য সংস্থার মতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। এ নিয়ে প্রার্থীদের মাঝেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
সোমবার মহাদেবপুর, মান্দা, বদলগাছী ও নওগাঁ সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। মহাদেবপুর উপজেলার নাটশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দক্ষিণ পাশে বাউন্ডারি প্রাচীর না থাকায় এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সেখানে এখনো সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি।
মান্দা উপজেলার খুদিয়াডাঙ্গা ও চকরাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো নিরাপত্তা প্রাচীর নেই। যদিও দুই দিন আগে সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। গোটগাড়ী শহীদ মামুন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজে টিনের প্রাচীর রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরাও চালু আছে।
বদলগাছী উপজেলার ঢেকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারদিকে বাউন্ডারি প্রাচীর থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কায় কেন্দ্রটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে সম্প্রতি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বরুনকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি প্রাচীর তুলনামূলক নিচু এবং এখনো সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন হয়নি। পশ্চিম নওগাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর ও পূর্ব পাশে প্রাচীর না থাকলেও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিদ্যালয়টিতে নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে।
নাটশাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলো মাহাতা বলেন, কেন কেন্দ্রটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তা জানা নেই। অতীতে এখানে শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ হয়েছে। তবে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
মহাদেবপুর উপজেলার পিরগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আতোয়ার রহমান বলেন, শুধু সিসিটিভি ক্যামেরা বসালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়া ও ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে।
গোটগাড়ী শহীদ মামুন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জহুরুল ইসলাম জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে এবং সবগুলো সচল রয়েছে। তবে নির্বাচন উপলক্ষে নতুন করে কোনো ক্যামেরা বসানো হয়নি।
বরুনকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাসিমা আকতার বলেন, মিটিংয়ে বলা হয়েছিল ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
নওগাঁ সদর উপজেলার পশ্চিম নওগাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাসেম আলী বলেন, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা এসে পরিদর্শন করেছেন। কেন্দ্রটি ঝুঁকিপূর্ণ কিনা জানি না। আমাদের নিজস্ব কিছু সিসিটিভি ক্যামেরা আছে।
প্রার্থীরাও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুর রাকিব বলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নওগাঁ-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী ডা. ইকরামুল বারী টিপু বলেন, ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারলে অনিয়ম ঠেকানো সম্ভব। তবে কিছু কেন্দ্রে ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
নওগাঁ-৫ (সদর) আসনের জামায়াত প্রার্থী আবু সাদাত মো. সায়েম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, ৩৬৪টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ২৫৫টি অফলাইন ও ১০৯টি অনলাইন বডি-অন ক্যামেরা ব্যবহৃত হবে, যা কন্ট্রোল রুম থেকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। নির্বাচনে দুই হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, নওগাঁর সব ৭৮২টি ভোটকেন্দ্রেই পর্যায়ক্রমে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবেন। প্রার্থীদের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পিএম