চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়ার একাংশ) সংসদীয় আসনে দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড়সড় ছেদ পড়েছে। কর্নেল (অব.) অলি আহমদ-এর ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এই আসনে পরাজিত হয়েছেন তাঁরই ছেলে, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-র ছাতা প্রতীকের প্রার্থী ওমর ফারুক। আর এই পরাজয়ের মধ্য দিয়েই রাজনীতির মাঠে প্রকারান্তরে কর্নেল অলির দীর্ঘ দিনের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমেদ পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ওমর ফারুক পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট। মাত্র ১ হাজার ২৬ ভোটের ব্যবধানে নির্ধারিত হয়েছে এই বহুল আলোচিত আসনের ফল।
চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম-১৪ বরাবরই কর্নেল অলির ব্যক্তিগত প্রভাবের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসনে তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও জীবনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার কারণে বিতর্কিত হলেও ভোটের অঙ্কে অলির ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নিজে প্রার্থী না হয়ে উত্তরসূরি হিসেবে ছেলেকে মাঠে নামান। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমর্থনে ছাতা প্রতীক নিয়ে ওমর ফারুক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও শেষ পর্যন্ত সেই কৌশল সফল হয়নি।
স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ কর্নেল অলির রাজনৈতিক অবস্থানের বারবার পরিবর্তন। সারা জীবন জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা করে শেষ বয়সে এসে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হওয়াকে ভোটাররা সহজভাবে গ্রহণ করেননি।
একই সঙ্গে বিএনপি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বিএনপির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বক্তব্য, ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ, এমনকি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য, সবকিছু মিলিয়ে একসময়কার আস্থাভাজন এই নেতার প্রতি সাধারণ ভোটারের আস্থা বড় ধরনের চাপে পড়ে।
প্রায় দুই যুগ পর বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম-১৪ আসনটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় বিএনপি। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন আহমেদকে দলে টেনে এনে বড় ধরনের রাজনৈতিক চমক সৃষ্টি করে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিদ্ধান্তটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, তবে ফলাফলের বিচারে কার্যকর।
এ পর্যায়েই উঠে আসে সবচেয়ে বিতর্কিত অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনের আগে থেকেই জসিম উদ্দীন আহমেদ স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক, প্রথম সারির বেসরকারি টেলিভিশন এবং অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টালের ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিজের পক্ষে টেনে নেন। নির্বাচনের দিন আনুমানিক ২০০ জন সাংবাদিক হাইস ও নোহা গাড়িতে করে চন্দনাইশে অবস্থান করেন, যা স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
এই অভিযোগ বিএনপি কিংবা জসিম উদ্দীন আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও, ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় কর্নেল অলি ও জসিম উদ্দীন আহমেদ একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে লিপ্ত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জয়ী হন জসিম উদ্দীন, আর পরাজিত হন অলি পরিবার।
এ আসনে বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থী মিজানুল হক চৌধুরীর উপস্থিতিও নির্বাচনী সমীকরণে ভূমিকা রাখে। যদিও ভোট বিভক্তির আশঙ্কা ছিল, তবে চূড়ান্ত ফলাফল বলছে, সেই বিভক্তি বিএনপির মূল প্রার্থীর জয় ঠেকাতে পারেনি।
নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫১৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৭ জন, নারী ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৫ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ জন।
মোট বৈধ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৭২৮টি। ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ। মোট প্রার্থী ছিলেন ৮ জন।
ভোট শেষে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন কর্নেল অলি আহমদ। ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, বিকেল চারটার পর কয়েকটি কেন্দ্রে জোরপূর্বক ব্যালট পেপার বাক্সে ঢোকানো হয়েছে। তিনি হাশিমপুর তরুণ সংঘ স্কুল, হাশিমপুর বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দোহাজারী আবদুর রহমান হাইস্কুলের নাম উল্লেখ করেন।
এলডিপি প্রার্থী ওমর ফারুকও আচরণবিধি লঙ্ঘন ও জাল ভোটের অভিযোগ করেন। অন্যদিকে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে বিজয়ী প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমেদ সময়ের কণ্ঠস্বর-কে বলেন, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধানের শীষের পক্ষে রায় দিয়েছে।
১৯৮১ সাল থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং চন্দনাইশে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ৮৭ বছর বয়সে এসে কর্নেল অলির রাজনৈতিক জীবনে এই পরাজয় বড় এক প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের মতে, বয়স বিবেচনায় আগামী নির্বাচনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সে হিসেবে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে অলির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সাম্রাজ্যের অবসান ঘটেছে বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন, এই পরাজয় কি শুধুই একটি নির্বাচনী হার, নাকি দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি?
এসআর