নাফ নদীর ওপারে টানা কয়েক সপ্তাহ, কারও কারও ক্ষেত্রে মাসের পর মাস অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানোর পর অবশেষে ঘরে ফিরলেন ৭৩ জেলে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টেকনাফের জালিয়া পাড়া ট্রানজিট ঘাটে তাঁদের নিয়ে আসে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ঘাটে তখন অপেক্ষা করছিলেন স্বজনেরা; কেউ কান্না চেপে দাঁড়িয়ে, কেউবা মোবাইল ফোনে বাড়িতে খবর দিচ্ছেন। নৌকা থেকে একে একে নামতে থাকেন ক্লান্ত ও রোদে পোড়া মুখের মানুষগুলো।
কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’ তাঁদের ধরে নিয়ে যায়। দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁদের ফেরত আনতে সক্ষম হয় বিজিবি।
বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, "ধারাবাহিক আলোচনার ফলেই ৭৩ জেলেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জলসীমা অতিক্রম করে মিয়ানমারে প্রবেশ করায় তাঁদের আটক করা হয়েছিল।"
তিনি জানান, সোমবার দুপুরে বিজিবির একটি প্রতিনিধিদল নাফ নদীর শূন্যরেখায় যায়। সেখানে আরাকান আর্মির সদস্যরা জেলেদের হস্তান্তর করেন। পরে তাঁদের জালিয়া পাড়া ট্রানজিট ঘাটে আনা হয় এবং প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
ঘাটে দেখা যায়, ফিরে এসেই অনেকে মাটিতে সেজদা দেন। কেউ জড়িয়ে ধরেন বাবাকে, কেউবা মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। টেকনাফের হ্নীলা এলাকার এক জেলের স্ত্রী বলেন, "ওরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বাচ্চারা বাবাকে খুঁজত। আজ ওকে ফিরে পেয়েছি, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।"
আরেক জেলে জানান, তাঁরা মাছ ধরতে গিয়ে হঠাৎ সশস্ত্র লোকজনের মুখোমুখি হন। এরপর তাঁদের ট্রলারসহ নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, "দিন-রাত একসঙ্গে কাটিয়েছি, কবে ছাড়বে জানতাম না। পরিবারের কথা মনে পড়লে বুকটা ফেটে যেত।"
টেকনাফ উপকূল ও নাফ নদী এলাকায় জলসীমা নিয়ে বিভ্রান্তি নতুন নয়। স্থানীয় জেলেরা বলছেন, অনেক সময় স্রোতের টানে কিংবা মাছের পিছু নিতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে সীমারেখা অতিক্রম হয়ে যায়। কিন্তু তার পরিণতি হয়ে দাঁড়ায় আটক, অনিশ্চয়তা আর পরিবারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে অন্তত ২০০ জেলে ট্রলারসহ আরাকান আর্মির হাতে আটক হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এই ৭৩ জন ফিরলেন। বাকি জেলেদের ফেরাতে বিজিবির পক্ষ থেকে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ।
ঘাটের ভিড় ধীরে ধীরে কমে এলে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছিল। ক্লান্ত জেলেরা পরিবারের সঙ্গে রওনা হন নিজ নিজ বাড়ির পথে। অনিশ্চয়তার অন্ধকার পেরিয়ে ফেরার এই মুহূর্ত তাঁদের কাছে যেন নতুন জীবনের শুরু। সীমান্তের টানাপোড়েনের মাঝেও ঘরে ফেরার আনন্দই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে।
এনআই