চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র কেরানীহাট কাঁচাবাজার ও গরুর বাজার প্রতিবছর নিয়ম মেনে ইজারা দেওয়া হলেও, বাজারের বাইরের ফুটপাত—যা সম্পূর্ণ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জায়গা—সেখান থেকে ‘হাসিল’ আদায়ের নামে চলছে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভাসমান দোকানিদের অভিযোগ, ইজারার সীমা অতিক্রম করে ফুটপাত দখল থেকে প্রতিনিয়ত টাকা আদায় করা হচ্ছে; না দিলে উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, কেরানীহাটের ফুটপাতে ভাসমানসিহ ছোট-বড় দুই শতাধিক দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে মাসে কয়েক লাখ টাকার মতো অর্থ উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অর্থের কোনো সরকারি হিসাব নেই।
জানা যায়, কেরানীহাটের কাঁচাবাজার ও গরুর বাজার ইজারা দেওয়া হয় স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নির্ধারিত শর্তে। ইজারা দলিলে সাধারণত বাজারের নির্দিষ্ট সীমানা, স্টল/শেড ও ভেতরের জায়গা থেকে নির্ধারিত হারে ফি আদায়ের অনুমতি থাকে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই ইজারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাজারসংলগ্ন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-বান্দরবান মহাসড়কের পাশে থাকা ফুটপাত—যা সওজের অধীন সরকারি জমি—সেখান থেকেও ‘হাসিল’ আদায় করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ফুটপাত বাজারের ভেতরের অংশ নয়, এটি জনসাধারণের চলাচলের পথ। তবুও প্রতিনিয়ত নামে টাকা নেওয়া হচ্ছে ‘ইজারার টাকা’ বলে।
কেরানীহাটের ফুটপাতে ফল, চা-নাশতার অস্থায়ী দোকান বসানো কয়েকজন বিক্রেতা জানান, প্রতি হাটবার ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
এক ভাসমান বিক্রেতা বলেন, আমরা গরিব মানুষ, ফুটপাতে বসে দুই টাকা রোজগার করি। প্রতিদিন লোক এসে টাকা নিয়ে যায়। না দিলে বসতে দেয় না, মালামাল ফেলে দেওয়ার ভয় দেখায়।
আরেক দোকানি অভিযোগ করেন, ইজারা বাজারের, কিন্তু টাকা নেয় ফুটপাত থেকে। এই টাকা কোথায় যায়, আমরা জানি না।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কের পাশে থাকা ফুটপাত সরকারি সম্পত্তি; সেখানে স্থায়ী বা অস্থায়ী দোকান বসানো এবং অর্থ আদায় সম্পূর্ণ অবৈধ। স্থানীয় সরকার আইন ও ফৌজদারি বিধান অনুযায়ী, সরকারি জায়গা দখল করে অর্থ আদায় চাঁদাবাজির শামিল—যা দণ্ডনীয় অপরাধ।
আইনজ্ঞদের মতে, বাজার ইজারা থাকলেও তা কেবল নির্ধারিত সীমানার মধ্যে প্রযোজ্য। ইজারার বাইরে, বিশেষ করে সওজের জমি থেকে টাকা আদায় বেআইনি এবং এটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও প্রশাসনের তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফুটপাতের বিভিন্ন অংশ ভাগ করে নির্দিষ্ট লোকদের মাধ্যমে টাকা তোলা হচ্ছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পরপর এসে সংগ্রহ করা হয় নগদ টাকা। অনেকেই অভিযোগ করছেন, এটি ইজারাদারের নাম ভাঙিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র পরিচালনা করছে।
একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, কাগজে-কলমে বাজার ইজারা আছে, কিন্তু ফুটপাতের হাসিল আলাদা সিন্ডিকেট তোলে। প্রশাসন দেখেও যেন না দেখার ভান করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে চললেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান হলেও কয়েকদিন পরই আবার আগের মতো ফুটপাত দখল হয়ে যায় এবং হাসিল আদায় শুরু হয়।
জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ফুটপাত সওজের জায়গা, সেখান থেকে কোনো হাসিল আদায়ের সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বাজারের ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে ফুটপাত থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ইজারাদারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাকে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করা হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকারি ইজারায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে না।
এফএস