বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার অন্তত অর্ধশতাধিক যুবকের ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন এখন লিবিয়ায় বন্দি। দালালের খপ্পরে পড়ে জিম্মি অবস্থায় সেখানে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুক্তিপণ দিয়ে ১৫ যুবক দেশে ফিরলেও বাকিদের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত।
ইতালি পাঠানোর নামে পাচার করে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তিপণসহ প্রত্যেকের কাছ থেকে ২৪ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে বরিশাল মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশে ফিরে আসা মেহেদী হাসান খান, আব্দুল হামিদ ও আব্দুর রহিম সরদার বাদী হয়ে মামলাগুলো দায়ের করেন।
আদালতের নির্দেশে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া থানা পুলিশ মামলাগুলো নথিভুক্ত করেছে। মামলার প্রধান আসামিরা হলেন—গৌরনদী উপজেলার জামাল মোল্লা (৫০), তাঁর দুই ইতালি প্রবাসী ছেলে জাকির মোল্লা (৩৫) ও সাকিব মোল্লা (৩৩) এবং জামালের দুই শ্যালক বাবুল বেপারী (৪৫) ও হাবুল বেপারী (৪২)। বর্তমানে জামাল মোল্লা ও তাঁর দুই শ্যালক কারাগারে রয়েছেন। তবে দুই ছেলে বিদেশে থাকায় তদন্তে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাদীদের ভাষ্যমতে, ‘বৈধ ওয়ার্ক পারমিট’ ও ‘মোটা অঙ্কের বেতনের’ প্রলোভন দেখিয়ে জামাল মোল্লা ও তাঁর সহযোগীরা জনপ্রতি ১৬ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেন। বিশ্বাস জোগাতে প্রায়ই ভিডিও কলে ইতালি প্রবাসী ছেলেদের সাথে কথা বলিয়ে দেওয়া হতো। এরপর গত ২৬ আগস্ট ভুক্তভোগীদের ইতালি পাঠানোর নাম করে সৌদি আরব ও মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবার না দিয়ে চলে অবর্ণনীয় নির্যাতন। পরবর্তীতে লিবিয়ার পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগী মেহেদী হাসান জানান, লিবিয়ার কারাগারে থাকাকালীন দালালেরা তাঁর পরিবারের কাছে ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেয়। জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে সেই টাকা দেওয়ার পর গত ৪ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
লিবিয়াবন্দি যুবকদের অভিভাবকদের তথ্যমতে, গৌরনদীর জাকির মোল্লা, বগুড়ার সাজু ও কুষ্টিয়ার লিটনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বড় চক্র কয়েক জেলার ১০৮ জন যুবককে জনপ্রতি ১৫-১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি পাঠানোর পথে পা বাড়ায়। গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনটি স্পিডবোটে করে লিবিয়া থেকে ইতালির পথে রওয়ানা হলে কোস্টগার্ড তাঁদের আটক করে। বর্তমানে ফিরে আসা ১৫ জন বাদে বাকিরা এখনো দালালের জিম্মায় বা কারাগারে আটকে আছেন।
গৌরনদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তারিক হাসান রাসেল জানান, দুটি মানব পাচার মামলার তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তিনজন আসামি কারাগারে আছেন এবং বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আগৈলঝাড়া থানার এসআই মো. মনিরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। পলাতক ও বিদেশে থাকা আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।